সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংকটের সামগ্রিক চিত্র। বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে, ফরাসি, জাপানি, আরবি, ফিনিস এবং কানাড়ি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সম্প্রতি ‘সূর্যাক্ষর’কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই সাহিত্য ব্যক্তিত্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সূর্যাক্ষরের সম্পাদক রেজাউল করিম।
রেজাউল করিম : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যের অবস্থা কেমন বলে মনে করেন?
সেলিনা হোসেন : আমি মনে করি, বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে খুবই সচল ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থা বিরাজ করছে। আমার আশা, এই সাহিত্য নিয়ে আমরা বিশ্বের দরবারে পৌঁছাব এবং আমাদের বাংলা সাহিত্য অনুবাদের কাজ হবে। সারা বিশ্ব অনুবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
রেজাউল করিম : বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে হলে প্রবীণ লেখক থেকে শুরু করে নতুনদেরও ভালো করতে হবে। আপনার কি মনে হয়, বর্তমানে নতুনরা ভালো করছে? কয়েকজনকে উল্লেখ করলে ভালো হতো।
সেলিনা হোসেন : আমি কারও নামোল্লেখ করব না। তবে নতুনরা ভালো করছে। আমাদের প্রজন্মের পরবর্তী প্রজন্মের ধারাটা আবার এগিয়ে আসছে।
রেজাউল করিম : সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তরুণ প্রজন্ম কি সাহিত্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
সেলিনা হোসেন : আমার মনে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তরুণ প্রজন্ম সাহিত্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটা চলতে দেয়া ঠিক হচ্ছে না। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে এবং সেই পথ থেকে সাহিত্যে নিয়ে আসতে হবে। আর যারা দেশের সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে তাঁদেরও এগিয়ে আসতে হবে এই অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য। আমরা যদি তা না করতে পারি তাহলে একটা সময়ে হয়তো একটা মূর্খ জাতি তৈরি হবে। এটা আমাদের সমাজের জন্য ভালো নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের দীর্ঘমেয়াদে ভোগাবে।
রেজাউল করিম : লিটলম্যাগকে বলা হয় সাহিত্যের আঁতুড়ঘর। অর্থাৎ এখানে লেখকরা সাহিত্য অধ্যয়ন করবেন এবং পরবর্তীতে বই প্রকাশ করে সাহিত্যের মূল শাখায় বিচরণ করবেন। বাংলাদেশের লিটলম্যাগের অবস্থা এখন কেমন মনে করেন?
সেলিনা হোসেন : আমার মনে হয় না লিটলম্যাগের অবস্থা ভালো। আমিও জানতে চাই, আসলে লিটলম্যাগের অবস্থা ভালো? তবে এই জায়গাটা ভালো করার চেষ্টা চলছে। আমরা আশাবাদী, একদিন এই লিটলম্যাগ নিয়ে আমরা আরও সামনে এগিয়ে যাব। আমাদের এখন থেকে বিশ্বমানের সাহিত্যিক তৈরি হবে।
রেজাউল করিম : বড় বড় লেখকরা আগে লিটলম্যাগে লিখতেন, নিজেকে যোগ্য করতেন তারপর বই প্রকাশ করতেন। এখন হচ্ছে এর উল্টো। বর্তমান সময়ে বহু লেখক রয়েছেন যারা লিটলম্যাগ থেকে উঠেননি। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
সেলিনা হোসেন : এটা ঠিক কাজ নয়। বরং লেখালেখির মাধ্যমে আগে নিজেকে তৈরি করা দরকার, তারপর বড় মাধ্যমে লেখা উচিত। যেমন একজন নতুন লেখক যদি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন এবং সেখানে নিজেকে তৈরি করেন তারপর বই প্রকাশ করেন সেটা ভালো হয়। এতে তারও নিজেকে জানার সুযোগ তৈরি হয়। যখন একজন লেখকের ছোট ছোট লেখা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পায়, পাঠকরা পড়েন, এবং এটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয় তখন তিনি নিজের অবস্থানটা জানতে পারেন। লেখালেখির বিভিন্ন বিষয় শিখতে পারেন। এভাবে করতে করতে একটা সময় তিনি মনে করবেন যে তিনি এখন বই প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত; তখন তিনি বই প্রকাশ করবেন।
রেজাউল করিম : অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশের সাহিত্যে কতটা অবদান রাখছে?
সেলিনা হোসেন : আমি মনে করি, বইমেলাটা চালিয়ে যাওয়া উচিত। বইমেলা হলে পাঠকরা বই ঘেঁটে দেখে বই কিনতে পারে। বইমেলায় বই নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এতেও সাহিত্যের জন্য ভালো। মেলায় অনেক পাঠকের আগমন ঘটে। এতে সাহিত্যের জগতটা বড় হয়। তাই আমার মনে হয়, বইমেলা বাংলা সাহিত্যে বড় অবদান রাখছে এবং এটা ভবিষ্যতেও রাখবে।
রেজাউল করিম : নতুন লেখকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সেলিনা হোসেন : আমার মনে হয়, নতুন লেখকদের আরও বেশি জানতে হবে। একটা বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে সেই বিষয়ে লেখা উচিত নয়। একজন নতুন লেখক যখন একটা বিষয়ে লেখা শুরু করবেন তখন তাঁকে সেই বিষয়ের খুব গভীরে যেতে হবে। ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে লেখা ঠিক নয়। এতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে। তাঁরও লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা কঠিন হয়ে যাবে। যদি একজন লেখক বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে লেখেন তাহলে অবশ্যই তাকে সমাজ ব্যবস্থা মনে গভীরভাবে ধারণ করতে হবে।
রেজাউল করিম : বাংলাদেশের প্রকাশকদের মধ্যে পেশাদারিত্ব মনভাবটা কেমন আছে বলে মনে করেন?
সেলিনা হোসেন : আমার মনে হয়, বাংলাদেশের প্রকাশকরা আমাদের সাহিত্য জগতটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁরা যদি নিজের টাকা খরচ করে বই প্রকাশ না করেন তাহলে পাঠকের হাতে বই পৌঁছাবে না। অনেক সময় তাঁদের বিভিন্ন রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমার বিশ্বাস, তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
রেজাউল করিম : বাংলাদেশের নারী লেখকদের নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সেলিনা হোসেন : বাংলাদেশে নারী লেখকরা সঠিকভাবে এগোতে পারছে না। আমি মনে করি, তাদের সঠিকভাবে এগোনোর জন্য যা কিছু দরকার তার মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। এই ফাঁকগুলো পূরণ করে তাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।
রেজাউল করিম : এই ফাঁকগুলো কী?
সেলিনা হোসেন : তারা যে বিষয়ে লিখেন সেই বিষয়টাকে তাদের আরও বেশি সঞ্চয় করা দরকার। এই সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে তাদের সেটা গভীরভাবে মনে ধারণ করতে হবে। তারপর সেই বিষয়ে লেখা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক নারী লেখালেখি করেন। কিন্তু তাঁরা যে বিষয়ে লিখেন সেই বিষয়ে গভীর জ্ঞান নেই। তাই তাঁর লেখাটা ভারি হয় না। পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে না। যখন তারা এই ফাঁকগুলো পূরণ করতে পারবে তখন তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।
রেজাউল করিম : বাংলাদেশের সাহিত্য এগিয়ে নিতে লেখক, প্রকাশক ও রাষ্ট্র সব পক্ষ এই মুহূর্তে পৃথক পৃথকভাবে কী ভূমিকা পালন করতে পারে?
সেলিনা হোসেন : লেখকদের উচিত আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সব ধরনের বোধের মধ্য থেকে তাঁর চিন্তাটা নিয়ে এসে একটা গল্পে প্রকাশ করলে তাহলে লেখাটা পূর্ণতা পায়। এতে একটা দেশের সাহিত্য অঙ্গন পূর্ণ হয়। এই পূর্ণতা বিদেশে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। এতে রাষ্ট্রেও বড় দায়িত্ব আছে। দেশের প্রবীণ লেখকদের সাহিত্যগুলো যদি বিদেশি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে বিদেশিরা আমাদের চিনতে পারবে। তাঁরা মনে করবে, বাংলাদেশ বলে একটা দেশ আছে যেখানে অনেক ভালো ভালো লেখক আছে। প্রকাশকদের কাছেও আমাদের তেমন দাবি আছে। কিন্তু তারা এমনিতেই সংগ্রাম করছে। তাই তাদের উদ্দেশ্যে এমন কিছু বলব না যাতে তারা কষ্ট পায়।
রেজাউল করিম : আপনার মূল্যবান সময় থেকে কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
সেলিনা হোসেন : তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ যে তুমি আমাকে নানা প্রশ্ন করার উদ্যোগ নিয়েছ।

