পর্ব ১
মোবাইল ফোন বেজেই চলছে একের পর এক। মাত্র চোখ লেগে আসছিল রিধির। একরাশ বিরক্তি ভাব নিয়ে উঠে, ফোন রিসিভ করল। অপর পাশ থেকে কথা ভেসে আসলো, আপনি কি রিধি? আদি সাহেবের ওয়াইফ?
রিধি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো, হ্যাঁ আমি উনার ওয়াইফ। কিন্তু কেন?
আপনার স্বামীর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তাড়াতাড়ি হসপিটালে আসেন।
অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো রিধির। তার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে, পৃথিবী চারদিকে ঘুরছে।
একই ঘটনা কী আবার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে আমার জীবনে?
রিধি চিৎকার করলো, না এমনটা হতে পারে না! তড়িঘড়ি করে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলল। বাসার কারো জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই পৌঁছে গেল হসপিটালে।
ইমারজেন্সিতে আছে আদি। রিধি উঁকি দিয়ে এক নজর দেখলো তাকে। ডাক্তার জানালো, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, ব্লাড লাগবে।
আমার গ্রুপের সাথে উনার গ্রুপ ম্যাচ করে। আপনি যতটুকু পারেন আমার থেকে নিন। আরো লাগলে প্লিজ জোগাড় করুন। টাকার চিন্তা করবেন না। শুধু আমার স্বামীকে বাঁচিয়ে তুলুন। রিধি বলল।
রিধি সারারাত হসপিটালেই ছিল। দোয়া দরুদ পড়ছিল এক মনে। বারবার মিনতি করছিল উপরওয়ালার কাছে, তিনি যেন আদির প্রাণ বাঁচিয়ে দেন। প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর আদির জ্ঞান ফিরলো। খবর পাওয়া মাত্র রিধি তাড়াতাড়ি আদির কাছে গেল। আদি চোখ মেলে তাকাছে। শরীর কেমন লাগছে এখন? রিধি জিজ্ঞেস করল।
মুখে হাসির রেখা টানলো আদি, ভালো লাগছে আগের থেকে। মা-বাবা কেউ আসেননি?
কষ্ট হছিল উনাদের, তাই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন আবার আসবেন।
আপনি যাননি? সারারাত কি এখানেই ছিলেন?
রিধি মাথা নাড়ালো।
নার্স বলল, আপনি নাকি রক্ত দিয়েছেন আমায়?
রিধি আবারও মাথা নাড়াল।
কেন দিয়েছেন? নাকি ধরে নিবো আপনিও আমায় ভালোবাসেন?
রিধি চোখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে, এক জীবনে একজনকেই ভালোবাসা যায়, দুজনকে না। আপনি আমার স্বামী হন। আপনাকে বাঁচানো, আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ানো, আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অভারথিংকিং ভাববেন না।
সারারাত জেগে থাকা, রক্ত দিয়ে বাঁচানো, এসব কিছুই কী শুধু দায়িত্ব? একবিন্দু ও ভালোবাসা নয়!
এর কি উত্তর দেবে, রিধি নিজেই জানে না। সে উঠে দাঁড়াল। তার চোখের কোণে স্পষ্ট জল দেখা যাছে। জানালার কাচ ধরে বাহিরে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় পড়ে গেল রিধি। ফিরে গেল তার অতীতে পৌষ মাসের রাত। ঘড়ির কাঁটায় রাত বাজে ১১টা। কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাতের প্রকৃতি। ঠিকমতো সামনের রাস্তাটাও দেখা যাছে না। মানুষজন তেমন একটা রাস্তায় নেই বললেই চলে। শুধু মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে যাছে। গাছ থেকে শিশির বিন্দু পড়ছে টুপটুপ শব্দে। কনকনে হিমেল হাওয়ায় ঠান্ডা দ্বিগুণ বাড়ছে।
কাসেম মিয়ার গায়ে পাতলা একটা শার্ট আর একটা চাদর। গত বছর এলাকার এক ধনী লোক এই চাদরটা দিয়েছিলেন, তা দিয়েই তার চলে যাছে। কিন্তু এই পাতলা শার্ট আর চাদরে এত শীত বাধ মানছে না। ঠান্ডায় পুরো শরীর রীতিমতো কাঁপছে। উনার মনে হছে কেও তাকে বরফ ভর্তি ফ্রিজে ডুকিয়ে রেখে দিয়েছে। সামনে এগোছে না পা। চোখ দুটো খোলা রেখে চাদর দিয়ে পুরো শরীর মুড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে চলছেন বাড়ির দিকে।
দুহাতে বড় দুটো ব্যাগ। তাতে আছে কিছু খরচপাতি আর শীতের কিছু পোশাক। শীত অনেক আগে পড়লেও উনার পরিবারের কারো শীতের পোশাক কেনা হয়নি। রোজগার যা হয় তাই দিয়ে কোনমতে কাসেম মিয়ার সংসার চলে। ছেলেমেয়ে কদিন ধরে বলছে, বাবা ঠান্ডা লাগে খুব, শীতের কাপড় কিনে দাও!
ফুটপাত থেকে ছেলেমেয়ে আর বউয়ের জন্য কিছু শীতের পোশাক কিনলেন কাসেম। নিজের জন্য কিছু কেনেননি কারণ পকেটে মাত্র বিশ টাকা অবশিষ্ট ছিল, ট্যাক্সি ভাড়া। যা দিয়ে অবশেষে ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার কিনতে হলো। কিছু না নিয়ে গেলে কেমন দেখাবে, যখন তার ছোট্ট ছেলে দৌড় দিয়ে খুশিতে ঘর থেকে বের হবে বাবা আসছেন, বাবা আসছেন বলে!
তখন যদি খাবার না পায় মুহূর্তেই মুখটা মলিন হয়ে যাবে ছেলের।
কাসেম মিয়া এক মনে হাঁটছেন। উনার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাছে আজকের ঘটনা। যখন তিনি এলাকার শফিকের দোকানে গেলেন বিস্কিট মুড়ি কেনার জন্য। উনি প্রায় সময় শফিকের দোকান থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার কিনেন। কখনও টাকা দিয়ে কখনও বা বাকিতে। আজকে শফিকের দোকান বন্ধ। রাত বাজে ১১টা। কাসেম মিয়া বুঝতে পারলেন না শফিকের দোকান কেন বন্ধ! হয়তো বেচারা কোন কাজে আটকে গেছে। সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে কাসেম পাশের হেলালের দোকানে গিয়ে হাসি মুখে বললেন, হেলাল ভাই আধা কেজি মুড়ি আর আধা কেজি বিস্কুট দেবে? কালকে টাকাটা দিয়ে দেব। পকেটে মাত্র ২০ টাকা আছে গাড়ি ভাড়া।
হেলাল অন্য কাস্টমারদের বিদায় করে কঠিন মুখে কাসেম মিয়ার দিকে তাকাল, আমার দোকানে বাকি বেচাকেনা হয় না। বন্ধুর দোকান বন্ধ বলে আমার দোকানে আসছো? নয়তো এদিকে পা ও রাখো না।
হেলালের কথা শুনে মুহূর্তেই কাসেম মিয়ার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
এটা ঠিক, উনি শফিকের দোকান থেকে বেশিরভাগ সময় জিনিসপত্র নেন কারণ শফিকের দোকান থেকে বাকি নেয়া যায়; আর পরে তা ইছামতো পরিশোধ করা যায়। শফিক ভাই তাতে কোন তাগদা দেন না; বরং সব সময় হাসিমুখে কথা কন। তাই বলে হেলাল কী এরকম কথা বলবে! অথচ আমরা একই এলাকার মানুষ।
কাসেম আর কোন কথা না বাড়িয়ে পকেটে থাকা ২০ টাকা বের করে হেলালকে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে হেলাল ভাই, তোমার বাকি দিতে হবে না, তুমি এই বিশ টাকার আমায় মুড়ি দিয়ে দাও।
তখনি দুই হাতে ব্যাগ নিয়ে কাসেম মিয়া বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। হাঁটতে লাগলেন এক মনে। পেছনে ফিরে কোন গাড়ির জন্য আর অপেক্ষা করেননি। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভিরভির করে বলতে লাগলেন, কত রকমের মানুষ আছে এই দুনিয়ায়!
বড় একটা টর্চলাইট হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রিধি। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। এত রাত হলো বাবা এখনও ফেরেননি কেন!
১০-১২টা গাড়ি রিধির পাশ দিয়ে চলে গেল কিন্তু কোন গাড়ি থেকে তার বাবা নেমে আসেননি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর রিধি দেখতে পেল তার বাবা হেঁটে আসছেন। সে কাছে গিয়ে দেখে, বাবা ঠান্ডায় একদম জড়োসড়ো হয়ে গেছেন। বিরক্তি কণ্ঠে বলল, কী ব্যাপার বাবা, এত দেরি কেন? আর হেঁটে আসছো কেন, গাড়ির কী অভাব নাকি?
ছাড় তো মা, রোজ গাড়িতে আসি। একদিন হেঁটে আসলে কিছু হবে না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বাবা বললেন। তাই বলে তুমি ১০ থেকে ১২ কিলো রাস্তা হেঁটে আসবা?
খরচ করার পর ২০ টাকা অবশিষ্ট ছিল। সেই টাকা দিয়ে মুড়ি কিনে নিয়েছি, মা। বাড়ি যাওয়ার পর রাতুল বের হবে হাসিমুখে। যদি কোন খাবার না পায় তাহলে তার মুখটা মলিন হয়ে যাবে না! তুই বল?
আমার কাছে আমার ছেলেমেয়ের মুখের হাসিটাই বড়। হেঁটে আসলে কষ্ট হয় না; বরং শরীর আরো ভালো থাকে।
রিধি রাগ দেখালো, তোমার এসব কর্মকান্ড আমার একদম ভালো লাগে না বাবা। একদিন খাবার না খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না।
ঠান্ডায় তুমি পুরো বরফ হয়ে গেছ। খরচের ব্যাগ আমার হাতে দাও আর তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো।
বাবা আর কোন কথা না বাড়িয়ে মেয়ের পিছ পিছ হাসিমুখে বাধ্য ছেলের মতো বাড়ি চললেন।
শীতের নতুন পোশাক পেয়ে রাতুল আনন্দে আত্মহারা! রিধি পুরো ব্যাগ ঘেঁটে দেখল মা, আপু, রাতুল আর তার, সবার শীতের পোশাক আছে। শুধু বাবার নেই।
রিধি তৎক্ষণাৎ বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা তোমার শীতের পোশাক কই ?
প্রতি উত্তরে বাবা হাসলেন, আমার পরনে আছে তো, এতেই আমার চলবে।
একটা শার্ট আর চাদরে শীত মানায় না বাবা! সোয়েটার লাগে। এতে তোমার একটু শীত ধরবে না; সবার জন্য কিনতে পারলে নিজের জন্য একটা কিনলে কী এমন ক্ষতি হতো? তুই কী জানিস রিধি? আমার মায়ের থেকেও বেশি শাসন তুই করিস! হাসতে হাসতে বাবা বললেন।
ঠিকমতো চললে তো আর শাসন করা লাগে না।
ঠিক আছে মা, আর এমন হবে না। এখন অনেক রাত হয়েছে। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। সকালে কলেজ যেতে হবে।
রাতে কিছুতেই রিধির চোখে ঘুম আসছে না। বারবার বাবার করুণ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমাদের জন্য বাবা কত কষ্ট করেন, রাত দিন এক করে কাজ করেন তবুও কিছুতেই কিছু হছে না। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন অবস্থা। পাঁচজন মানুষের খাওয়া, ভরণ পোষণ একজন মানুষ দিনমজুর হয়ে চালানো তো মুশকিল। মাঝে মাঝে তো বাবার কোন কাজই থাকে না। তখন আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়। এভাবে আর কতদিন চলবে আল্লাহ জানেন। বাবা তার সর্বোচ চেষ্টা চালিয়ে যাছেন আমাদের ভালো রাখার।
বাবাদের বোধহয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে না!
সকাল হতেই রিধি বেরিয়ে পড়ল। মা পেছন থেকে ডাকলেন, রিধি! এত সকালে কোথায় যাবি মা?
কাজ আছে মা।
তো চা খেয়ে যা।
চা খাই না আমি।
তবে পান্তা ভাত খেয়ে যা। গ্যাসের জন্য ভালো হবে, পেট ভালো থাকবে।
রিধি কাঁদে ব্যাগ নিতে নিতে বলল, ভালো লাগছে না, পরে এসে খাব।
আফজাল সাহেব বসে আছেন বারান্দায়। প্রতিদিনের রুটিনমাফিক তিনি খবরের কাগজ পড়ছেন। পাশের টেবিলে রাখা, অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। চা ঠান্ডা হয়ে যাছে সেদিকে উনার খেয়াল নেই। এমন সময় ঝরনা এসে বললো, বাবা কলেজ যাব, টাকা দাও।
আফজাল সাহেব মেয়ের হাতে ১০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিলেন। ঝরনা চোখমুখ নাচাতে নাচাতে বলল, এতে হবে না বাবা।
বাবা ভ্রু কুচকালেন,
তোমার কলেজ ভাড়া তো ৩০ টাকা মা। এত টাকা দিয়ে কী করবে?
উফ বাবা! বন্ধু-বান্ধব আছে, চা-কফি খাব।
বাবা হাসিমুখে আরো ২০০ টাকা ঝরনার হাতে দিলেন। টাকা পেয়ে ঝরনা হাসিমুখে কলেজের জন্য রওনা হলো।
মালিহা বেগম এতক্ষণ ধরে বাপ-মেয়ের কান্ড দেখছিলেন দূর থেকে। ঝরনা চলে যাওয়াতে তিনি এগিয়ে এসে আফজাল সাহেবকে বললেন, মেয়ের সব কথা কী শুনতে হবে? দিনকে দিন টাকা-পয়সা দিয়ে মাথায় তুলছো ঝরনাকে। প্রতিদিন এত টাকা নিয়ে কী করে, জানো?
বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয়, আর কসমেটিক্সের উপর কসমেটিক্স কেনে।
আফজাল খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে বললেন, বাদ দেও না মালিহা। একটাই তো মেয়ে আমাদের। তুমি জানো তো, ও আমার কলিজার টুকরা। কিছু চাইলে আমি না করতে পারি না। তাছাড়া আমার তো যথেষ্ট টাকা-পয়সা আছে; দিতে আপত্তি কোথায়?
তাই বলে যেমন তেমন খরচ করবে? তোমাদের বাপ-মেয়ের মধ্যে আমার কোন কথা বলাই উচিত না। কে শুনে কার কথা বলেই মালিহা বেগম ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
আফজাল সাহেব স্মিত হেসে অর্ধেট খাওয়া চা টা শেষ করে আবার খবরের কাগজ পড়ায় মন দিলেন।
চলবে………

