এক.
রতনকে চেনে না এমন লোক গ্রামে নেই। রতনপুর গ্রামটা তার নামের সাথে মিলে যাওয়ায় অনেকে ঠাট্টা করে বলে রতনপুরের রতন। তাকে চেনবে না আর কে। রতন বাবা-মার বড়ো ছেলে। রতনের আরেকটা ছোটোভাই আছে। ও ক্লাস এইটে পড়ে। ওর নাম কাঞ্চন। মা-বাবা দুই-ছেলের নাম রেখেছিলÑ তারা যাতে অনেক টাকা-পয়সার মালিক হয়ে তাদের গরিবি হালটাকে গুছিয়ে দেয়। কাঞ্চন মানে টাকা-পয়সা। রতন মানে তো সবাই জানে। কথায় বলে না মানিক রতন। মানিক মানে সাতরাজার ধন। সেই মানিক কেউ দেখেছে কিনা জানি না। সাপের কাছে নাকি সেই মানিক থাকে। সাপের মাথায় যে মণি দেখা যায় তাতেই নাকি মানিক নামক মহামূল্যবান রত্নটি লুকায়িত।
রতন এবারসহ তিনবার এসএসসি পরীক্ষা দিল। আগের দুইবার একটা একটা বিষয়ে ফেল করে তার পরিচিতিটাকে আরও বাড়িয়েছে। এবারে তার আশা নিশ্চয় সে পাশ করবে। এবার অনেক খেটেছে। দিন এনে, দিন খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে মা অনেক টেনে-টুনে পরীক্ষার এক মাস আগে থেকে রতনকে গরুর দুধ রোজ করে খাইয়েছে। যাতে রতনের ব্রেন ভালো থাকে। পড়া যেন মুখস্ত থাকে। রতন বাবার সাথে সকাল-বিকাল দোকানেও খাটে। পরীক্ষার আগে তাকে পড়ার জন্য একবেলা খাটুনি কমিয়ে দিয়েছে। বাবার কষ্ট হলেও অন্তত ছেলে যাতে এবার পাশটা করে একটা সার্টিফিকেট পায়। বাবার এক পরিচিতজন কথা দিয়েছে, রতন যদি এসএসসি পাশ করে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে। একটা ছোটোখাটো চাকরি পাইয়ে দেবে। সেই আশায় রতনও এবার প্রাণপণে চেষ্টা করে পরীক্ষা দিয়েছে। ইংরেজি আর অংকে একটু কাঁচা আর কি। গতবার অংকে, তার আগেরবার ইংরেজিতে খারাপ ফল করেছিল। এবারে ঐ দুটো বিষয়ে অন্য একটি স্কুলের শিক্ষকের কাছে দু-মাইল পায়ে হেঁটে গিয়ে প্রাইভেট পড়েছে। পাড়ার এক কাকার পরিচিত শিক্ষক। গরিব বলে টাকা ছাড়া তাকে পড়িয়েছেন। রতনও বুঝে সবকিছু। বাবা মা সারাক্ষণ রতনের চিন্তায় অস্থির। এত হাবাগোবা হলে জীবন চলবে কী করে? একটুও বুদ্ধি নেই রতনের। এ দুনিয়ায় একটু বুদ্ধি না থাকলে কেউ চলতে পারে?
রতন যে একেবারে বুদ্ধিহীন তা কিন্তু নয়। তবে সে নির্বিবাদী লোক। কোনো ধরনের ঝুট-ঝামেলায় সে জড়াতে চায় না। খেলাধুলাতে এখন আর তার মন টানে না। কেউ তাকে খেলতেও ডাকে না। তাতে তার কোনো আপত্তিও নেই। তার বন্ধুরা তো সবাই পাশ করে দুইবছরে কেউ কলেজে কেউ বা শহরে গিয়ে চাকরি-বাকরি করছে। কেউ কেউ তার মতো ফেল করে মাঠে-ঘাটে কামলা খাটছে, তার সৌভাগ্য বলতে হবে যে, মা-বাবা মন খারাপ করেও তাকে তৃতীয়বারের মতো পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। মা বাবার মনের স্বপ্ন তাদের রতন পাশ করবেই। সে তো সময় পেলেই বই নিয়ে বসে পড়ে। অন্য ছেলেদের মতো দুরন্তপনা নয় সে। দুইবার ফেল করে তার মুখটা কালো হয়ে থাকে। তার হাসি পেলেও তা প্রকাশ করে না।
রতনকে প্রধান শিক্ষক খুব পছন্দ করে। কিন্তু দুইবারেও পাশ করতে না পারায় স্যার তার উপর বেজায় নাখোশ। গতবারও পরীক্ষার ফরম-ফিলাপের দুইশত টাকা স্যারের পকেট থেকে দিয়েছে। এবার স্কুল কমিটির সভাপতিকে বলে পুরো টাকাটা ম্যানেজ করে দিয়েছে। এ-জন্য রতনও তার শোধ হিসেবে স্যারের ঘরে বাজার সদাই পৌঁছে দিয়ে আসে। স্যারের এটা-সেটা ফয়-ফরমাইশ খাটে। স্যার রতনকে পছন্দ করে শান্ত-সুবোধ বলে। তার উপর রতনের একটা ভালো অভ্যাস আছে সে বই পড়ে। এত পড়েও সে পরীক্ষায় ফেল করে কেন, তা বাবা-মা বুঝতে পারে না। রতন ইশকুলের লাইব্রেরি থেকে ‘শিশু সন্দেশ’, ‘শিশু ভারতী’, ‘শিশু সাথী’, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের অনেক বই পড়ে শেষ করেছে। হ্যারিকেনের আলোতে রতন পাঠ্যবই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্পের বইও পড়ে। পরীক্ষার আগের রাতেও সে শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ বইটির অর্ধেকটা শেষ করেছে। তবে তা লুকিয়ে লুকিয়ে। মা তো কী বই পড়ে তা বুঝে না। তবু রতন লুকিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে নিজেও ছড়া বা গল্পের মতো কিছু লিখার চেষ্টা করে। তবে তার লেখা একটি ছড়া ইশকুলের শতবর্ষের অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে প্রকাশিত দেয়াল পত্রিকায় সবার নজরে পড়েছে। তখন সবাই তাকে বেশ বাহবা দিয়েছিল। সে বন্ধুদের ডেকে ডেকে দেয়াল পত্রিকা দেখিয়ে মনের তৃপ্তি নিয়েছে। সেটা ছিল তার প্রথমবারের পরীক্ষার আগের বছর।
দুইবার পরীক্ষায় ফেল করে রতন একটু চাপে আছে। চারপাশের লোকজন তার দিকে কীভাবে যেনো তাকিয়ে থাকে। কেউ কিছু সামনে না বললেও রতন বুঝে তাকে নিয়ে কেউ না কেউ কিছু বলে। ভালো বা মন্দ। সে যে নির্বিবাদি, যে কারণে কারো কথায় সে মাথা ঘামায় না। এখন তার একটাই চিন্তা পাশটা করতে পারলে যে-করেই হোক, সে ঢাকা চলে যাবে। ঢাকায় গিয়ে তার কাপলের লিখনকে খণ্ডনের চেষ্টা করবে।
কপালের লিখন বলে কি কিছু আছে? থাকলে সেই লেখা কেউ দেখতে পায় না কেনো? রতন একবার সেই লেখা দেখতে চায়। সে ভাবে, বাবা চায়ের দোকান করবে এটা কি বাবার কপালের লিখন? বাবার কপালে যদি চায়ের দোকান থাকে, আমি তো বাবার ছেলে, আমার কপালে কি মিষ্টির দোকান থাকবে নাকি? না, আরো খারাপ কিছু। রতন কপালের লিখনকে বিশ্বাস করে না। সে এই পর্যন্ত যত বই পুস্তক পড়েছে, কোথাও কপালের লিখন বলে কিছু পায়নি। তাহলে তার বেলায় হবে কেনো? কপালে যা-ই লেখা থাক না কেন, রতন সে লেখাকে মুছে দিয়ে বড়ো চাকরি করে দেখিয়ে দিতে চায়, নিজের চেষ্টায় মানুষ উন্নতি করতে পারে।
ক্লাসে একবার তুষার স্যার জিজ্ঞেস করছিল বড়ো হয়ে কে কী হতে চায়। কেউ বলেছে, ডাক্তার হবে, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বিজ্ঞানী। রতন সেদিন কিছুই বলছে না দেখে স্যার তাকে ডেকে নেয়। তোর কোনো লক্ষ্য নেই। শুধু লেখাপড়াই করে যাবি? কিছু হবি না? এ সময় ক্লাসে হাসির রোল পড়ে যায়। শেষে রতন বুদ্ধি করে বলে, আমি অনেক বড়ো হব স্যার। আবার হাসির রোল শুরু হলে স্যার সবাইকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলে। সেদিন তুষার স্যার রতনের অনেক বড়ো হওয়াকে সমর্থন করেছিল। তিনি বলেছেন, এটাই তোর জীবনের লক্ষ্য। অনেক বড়ো সবাই হতে পারে না। বড়ো হতে হলে ছোটো হতে হয়। রতন সেই ছোটো হয়ে বড়ো হতে চাছে। সে সবার মতো না। সে ভাবুক। মানুষের জন্য কিছু করা বড়োলোকের পক্ষেই সম্ভব। বড়ো-মনের লোক হওয়াটা অনেক বড়ো ব্যাপার। টাকা পয়সা থাকলে কেউ বড়ো হতে পারে না। যদি না তার মধ্যে বড়ো-মন না থাকে। বড়ো-মন তারই হয়, যে নিজেকে হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা থেকে দূরে রাখতে পারে। সেদিন তুষার স্যার রতনকে উপলক্ষ করে অনেক কথাই বলেছে। রতন সেই কথাগুলোই এখন মনে করে। তাকে যে অনেক বড়ো হতে হবে।
বাবার পরিচিত একজন তো বলেই রেখেছে পাশ করলে ঢাকা নিয়ে যাবে। বাবার সেই পরিচিতজন রতনকে ঢাকায় না নিয়ে গেলেও সে নিজের চেষ্টায় ঢাকায় যাবে। এজন্য ঢাকায় থাকা এলাকার লোকজনের খোঁজ করে মনে মনে, আর ভাবেÑ যদি কিছু টাকা পায়। ঢাকা যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া যে লাগবে। বাবা-মা তো কখনো সেই টাকা দেবে না। তারা কোথায় পাবে পাঁচশো হাজার টাকা। দিন, চলে নাÑ বাবার ছোট্ট চায়ের দোকান। গ্রামের মানুষ অত চা-টাও খায় না। সারাদিনের চা বিক্রি করে যা রোজগার হয় তাতে চাল ডালের পয়সাও ঠিকমতো হয় না। বাজারের যা অবস্থা। কবে মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছে রতনের মনেই নেই। মাংস তো দূরের কথা। রতন স্বপ্ন দেখে একদিন সে অনেক টাকার মালিক হবে। সেই টাকা কীভাবে পাবে, সে জানে না। ঈশ্বরের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করে, সে যেনো একদিন অনেক টাকার মালিক হতে পারে। বাবা-মার যেনো কষ্ট দূর করতে পারে। সে যদি অনেক টাকা পায়, বাবাকে থানা সদরে বড়ো একটা চায়ের দোকান করে দেবে। মাকে আর ছেড়া শাড়ি পরতে দেবে না। ছোট ভাইকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাবে। গ্রামের যারা লেখাপড়া করতে পারে না, তার মতো টাকার অভাবে, তাদেরকে সে বই কিনে দেবে। এসএসসি পরীক্ষার ফরম-ফিলাপ করতে টাকা দেবে।
এসএসসির রেজাল্ট বেরুনোর আরো কয়েকদিন বাকি। পত্রিকায় নাকি খবর বেরিয়েছে ১০ তারিখ রেজাল্ট দেবে। সেদিন সন্ধ্যায় হেডস্যারের বাসায় বাজার নিয়ে গেলে স্যার নিজে থেকেই রতনকে বলেছে এ খবর। সে হিসেবে আর চারদিন বাকি। রতনের চোখে-মুখে একধরনের শঙ্কা। যদি পাশ করতে না পারে। প্রতিবার একটা বিষয়ে ফেল করে সে। এবার তো মোটামুটি প্রস্তুতি ভালো ছিল। বিমল স্যারের কাছে প্রাইভেটও পড়েছে। বিমল স্যারের ছাত্ররা এ পর্যন্ত কেউ ফেল করেনি। রতন আশায় বুক বাধে। অন্তত পাশটা করতে পারলে হয়। তারপর তো ঢাকায়। গ্রামে আর থাকবে না। গ্রামের লোকের ঠাট্টা মশকরা তার ভালো লাগে না। হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একজনের ডাক শুনে মাঝ-পথে দাঁড়ায় রতন। সন্ধ্যার আবছা-আলো আঁধারে মুখ দেখা না গেলেও, ডাকটা তার খুব পরিচিত মনে হয়েছে। মিনিট দুই পরে কাছে এসে ধাক্কা দিয়ে বলে, কীরে চিনতে পারিসনি? আমি কালাম।
আরে চিনতে পারব না ক্যা। খুব চিনতে পারছি তো। কালাম তুই না শহরে চাকরি করিস?
হ, পরীক্ষায় ফেল করার পর মামার দোকানে কাজ করি। খাতুনগঞ্জে মামার মুদির-দোকান আছে। মাঝে মাঝে বাড়ি আসি তো। গত মাসে এসেও তোকে খুঁজেছি।
ও। আমি তো ভাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়েছি। কদিন পরে রেজাল্ট বেরুবে। পাশের আশায় আছি। কালাম হাতের ভেতর সিগেরেট রেখে মাঝে মাঝে টান মারছে আর রতনের সাথে চলতে চলতে কথা বলে যাছে। রতন কিছু বলে না। কালামকে বেশ ছটফটে মনে হছে। ইশকুলে থাকতে সে রতনের মতো চুপচাপ থাকত। অঙ্ক আর ইংরেজি স্যারের বেতের বাড়ি খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকতো। সে কালাম এখন সিগারেট টানছে। দামি সিগারেটই মনে হছে। তবে পরীক্ষার আগে আগে কালাম, বাবু, মুজিব প্রায় চুরি করে আবুল বিড়ি খেত। বাজারে গেলে তাদের তিনজনকে দেখা যেত কোনো আড়ালে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতে। মুজিব পাশ করেছে একবারেই। সে এখন তার বোনের বাড়িতে থেকে পটিয়া সরকারি কলেজে পড়ছে। বাবুও তার বাবার মুদির দোকানে বসে। কালামের দেখা পেয়ে রতন মনে মনে খুশি হয়। এক সাথে পাশাপাশি হাঁটছে আর নানা কথা বলছে। পাশ করতে না পারলে কী করবে রতন কালামকে বলে। কালাম তাকে আশ্বাস দেয়, খাতুনগঞ্জে তার মামার মুদির দোকানের মতো অন্য দোকানে তার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। রতন যেনো অথৈই নদীর মাঝে একটু কূল পেল। কালামের বাড়ি রতনের বাড়ি থেকে একটু দূরে। তবু কথায় কথায় কালামের বাড়ির কাছেই চলে যায় রতন।
সন্ধ্যার পর রাত নেমে এসেছে। পাশে মন্দির থেকে কাঁসার ঘণ্টার আওয়াজ আসছে। চারপাশে গাছপালাগুলোও স্থির হয়ে আছে। মাঝে মাঝে জোনাক পোকাও দেখা যাছে। মৃদু বাতাসে হালকা ঠান্ডাও লাগছে। শীতের বাকি যদিও মাস-দুই আছে। পুকুরের উত্তর পাড়ে মাকড়সার জালের মতো মনে হছে। ওরা দু’জন কালামের বাড়ির কাছে পুকুর পাড়ে বসে গল্প করছিল। কালাম শহরের অনেক গল্প বলে। মাঝে মাঝে ‘জলসা সিনেমা’ হলে গিয়ে ছবি দেখে আসে। মামা ছুটি দেয়। খাতুনগঞ্জে নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে কালামের। কলেজে পড়া দু’জন বন্ধু আছে তার। তাদের সাথে মাঝে মাঝে কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যায়, সেখানে মেয়ে বন্ধুদের সাথে গল্প করে কত কী। কালামের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কথা শুনে রতন। রতনও মাঝে মাঝে একটি রাজনৈতিক দলের মিটিং-এ যেত। পরীক্ষায় ফেল করার পর বড়োভাইরা ডাকলেও আর যেতে ইছে করে না। মনে যে বড়ো কষ্ট। এই দুই বছরে ঐ বড়োভাইটা নাকি ঢাকায় গিয়ে লেখাপড়া করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একবার রতনকে সে-কথা বড়োভাই নিজেও বলেছে। আর দেখা হয়নি। রতন গম্ভীর হয়ে আছে। কালাম বলল, চল ঘরে গিয়ে বসি। রাত হয়ে যাছে। রতন পরদিন আবার আসার কথা বলে কালামের কাছ থেকে বিদায় নেয়। বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে রতন ভাবনার অতল গহ্বরে ডুবে যায়। কালামের সাথে খাতুনগঞ্জ যাবে, নাকি বাবার পরিচিত জনের সাথে ঢাকায় যাবে।
কালাম ইশকুলে থাকার সময় রতনকে খুব একটা পাত্তা দিত না। রতনও তখন কালামের সাথে এত মিশত না। বাবু, মুজিব ও হাসমত ছিল রতনের প্রতিবেশী। কালামের বাড়ি একটু দূরে। রতনের সাথে প্রতিবেশী বন্ধুদের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক। রতন হিন্দু হলেও বাবু, মুজিব বা হাসমতের সাথে ইশকুল সহপাঠী হিসেবে বেশ ভাব। ওরা তিনজন মুসলিম হলেও রতনের বাড়িতে তাদের যাওয়া-আসা ছিল বেশ। ওরা প্রাইমারি থেকে ইশকুল সহপাঠী। এক সাথে একজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ত। পড়ার ঘর ছিল মুজিবদের ঘরে। আবার সেই শিক্ষক ভাড়ায় থাকত রতনদের বাড়িতে। স্যারের নাম ছিল গোপাল। তিনি কলেজে পড়তেন। রতনের সাথে বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। রতনরা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর গোপাল স্যার চাকরি পেয়ে শহরে চলে যায়। সেই থেকে তারা বিছিন্নভাবে প্রাইভেট পড়ত। রতনরা গরিব বলে পরীক্ষার আগে মাস-দুই প্রাইভেট পড়ত। হাই-ইশকুলে গিয়ে তিনজনের সর্ম্পক অনেক মজবুত হয়। ক্রমে তারা বড়ো হছে, একে-অপরকে বুঝতে শিখছে। ঈদের সময় হাসমতদের সাথে রতন বেড়াতে যেত প্রতিবছর। ওদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে হিন্দুর ছেলে রতনকে নিয়ে যেতে ওদের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। আত্মীয়-স্বজনরাও রতনকে নিয়ে কখনো প্রশ্ন করত না। তেমনি দুর্গাপুজার সময়ও রতনের সাথে ওরা তিনজনও বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে ঘুরে পুজা দেখত। কত না মিল ওদের বন্ধুত্বে। ওরা তিনজন এক বাড়িতে, রতন এক বাড়িতে। কিন্তু দুই-বাড়ির কিছু লোক আবার এদের চলন-বলন নিয়ে পেছনে কথা বলত। তাতে ওরা কেউই কান দিত না। ওরা দুই-পাড়ার আরো ছেলেদের নিয়ে একটি ক্লাবও করে। নাম ‘কিশোর সংঘ’। ক্লাব ঘর ছিল রতনের রেডিং-রুমটা। ওটা একটা দেউরি-ঘরের মতো ছিল। রতন সকাল বিকাল সে ঘরে পড়াশোনা করত, মাঝে মাঝে জ্বালানির লাকড়ি, শুকনো গাছের ডালপালা রতনের মা কুড়িয়ে রাখত। সেই ঘরে কেরামবোর্ড খেলা চলত। রতনের দাদু ও ঠাম্মা ছিল রতনের প্রিয় বন্ধু। তারা রতনকে সাপোর্ট করত। বাবা-কাকারা বকাবকি করলেও ওরা দু’জন রতনের পক্ষে কথা বলত। রতন তাতে উৎসাহবোধ করত। ‘কিশোর সংঘ’ দিন দিন বড়ো হতে লাগল। অন্য পাড়ার ছেলেরাও ক্লাবের সদস্য হছে। রতন ছিল সাধারণ সম্পাদক। মুজিব ছিল সভাপতি। দু’জনই শান্ত নরম মনের। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ক্লাবের জন্য ফুটবল, ক্রিকেট খেলার ব্যাট কিনতো ওরা। রতন গরিব বলে আটআনা-চারআনা করে জমা করে দশ টাকা, বিশ টাকা মুজিবের হাতে তুলে দিত। ক্লাবের সদস্য সংখ্যা যখন বেড়ে গেল তখন রতনের ঘরে সবার যাতায়াতও বেড়ে গেল। বাড়ির লোকজন তখন আপত্তি করে রতনের বাবা-মার কাছে। ফলে হাসমতদের বাড়ির সামনে একটা দোকান-ঘর ভাড়া নেয়া হয়। মাসে ৪০ টাকা ভাড়ায়। জমিদার ছিল নূর আহমদ সাহেব। তিনি খুবই ভালো লোক ছিল। উনার দুই ছেলেও ক্লাবের সদস্য হয়। তারপর থেকে ক্লাবের নতুন যাত্রা। রাস্তার পাশে হওয়াতে পথচারী অনেকে উঁকি দিয়ে একবার দেখে। ক্লাবে বই পড়ার কথা তুলে রতন। নিজের টাকায় ‘রেলওয়ে লাইব্রেরি’ থেকে প্রথম দশটা বই কিনে আনে। তারপর যখনই টাকা পয়সা হাতে এসেছে একটা-দুইটা বই কিনে এনে ক্লাবে সাজিয়ে রাখত। কেউ পড়ুক-বা না পড়ুক রতন প্রতিদিন বিকেলে ক্লাবে গিয়ে একঘণ্টা বই পড়ত। নীহাররঞ্জন, শরৎচন্দ্র, কত কবির কত বই। আজ সব যেনো হারানো স্মৃতি।
কালামের সাথে হাইইশকুলে গিয়ে পরিচয় হয়। রতন তখন থেকে খানিকটা দূরত্বে থাকত। কালামের দুরন্তপনা একটু অন্যরকম বলে রতন নিজেকে সরিয়ে রাখত। আজ কালামকে বড়ো আপন মনে হয় রতনের। কালাম যেনো বদলে গেছে। কালামের কথাবার্তাও বুদ্ধিমানের মতো মনে হয়। এ পরিবর্তন কি কালামের হাতে টাকা আসায়, নাকি অন্য কোনো কারণ। রতন বাড়ির দিকে পা বাড়ায় আর এসব নানা ভাবনায় ডুবে যায়।
দুই.
রতন বাড়ি ফিরতে কখনো এত রাত করে না। আজ দেরি হওয়ার কারণ জানতে চায় মা। রতন কালামের সাথে দেখা হওয়ার কথাটা জানায়। সে যে খাতুনগঞ্জে মুদির দোকানে চাকরি করে তাও বলে। মা সে কথায় তেমন খুশি হয়নি। রতনকে মা বড় একটা অফিসে কাজ করতে স্বপ্ন দেখেÑ সে পিয়ন হোক বা কেরানি।
আমাকেও একটা চাকরি পাইয়ে দেবে বলল কালাম।
মুদির দোকানে? মা জবাব দেয়।
মুদির দোকানে চাকরি কি খারাপ মা? কালাম কত দামি শার্টপ্যান্ট পরে আসছে শহর থেকে। সিগারেট খাওয়ার কথাটা চেপে যায় রতন।
কালাম কি মেট্রিক পাশ করেছে?
না মা। আমার মতো ফেল করে আর পরীক্ষা দেয়নি। মামার দোকানে গিয়ে চাকরি শুরু করেছে দুই বছর ধরে।
তুইও তো তোর বাবার দোকানে কাজ করিস। তয় তুই পাশ করলে ঢাকায় গিয়ে চাকরি করবি। তোর বাবার বন্ধু তো কথা দিছে।
মা, ঢাকা যাব। তোমাদের ছেড়ে আমি থাকতে পারব?
শহরে হলে যখন মন চায়, তোমার কাছে আসতে পারব।
ঢাকায় যারা চাকরি করে তারা বাড়ি আসে না? তুইও সেভাবে আসবি। তোর বাবা, আমি কত কষ্ট করছি তোর জন্য। তুই এবার পাশ করবিরে বাপ, আমার মন বলছে। তুই কালামকে কথা দিস না।
রতন মায়ের কথায় কোনো জবাব না দিয়ে গামছাটা নিয়ে হাতমুখ ধুতে যায় পুকুরে।
আমি তো চাকরিই করব। তাহলে মুদির দোকান কি খারাপ? কালাম কত সুন্দর করে কথা বলে। সে তো তার বন্ধুদের সাথে কলেজেও যায় বলছে। আমিও যদি পাশ করতে পারি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ালেখাও করলাম, চাকরিও। মুদির দোকানের চাকরিতে মায়ের আপত্তি কেন? কালাম তো ভালোই মাইনে পায় মনে হলো। আমি যদি মাসে মাসে মাইনের টাকাটা মা-বাবাকে দিই, তাহলে তো আমাদের আর কোনো কষ্ট হবে না। রতন কিছুই ভেবে পায় না।
ঘুমাতে গিয়ে বিছানায় বসে বসে বই পড়ার অভ্যাস রতনের। লুৎফর রহমানের ‘যুবক জীবন’ বইটি পড়ছিল। পড়তে পড়তে কত কথায় মনে পড়ে। যদি সে পাশ করে তাহলে কী করবে, যদি কোনো কারণে পাশ না করে, আবার যদি একটা বিষয়ে খারাপ করে, তখন কী করবে? এসব ভাবনায় ডুবে যায় রতন। হ্যারিকেনের তেল ফুরিয়ে আসছিল বলে মিটমিট করে জ্বলছে। রতন বই হাতে ভাবনার জালে।
এসএসসির রেজাল্ট বেরিয়েছে। পত্রিকায় খরব বেরিয়েছে। সবাই পটিয়া থানা সদরে গিয়ে পত্রিকা কিনে হাতে করে বাড়ি ফিরছে। পত্রিকায় রোল নম্বার ছাপা হয়েছে। বাবার কাছ থেকে দু-টাকা নিয়ে ছুটছে রতন। কয়েক মাইল পথ। অনেকে সাইকেলে ছুটছে। সবার মুখে মুখে রেজাল্টের কথা। পথে একজনের হাতে পত্রিকা দেখে, রতন দেখতে চাইল। লোকটি রতনকে সময় নেই বলে চলে গেল। মুখ শুকিয়ে যায় রতনের। তার মনে অজানা ভয়। তবুও নিজের চোখে পত্রিকায় না দেখা পর্যন্ত তার কোনো ভয় করলে চলবে না। একবার ভাবে পত্রিকায় যদি তার রোল নম্বার ছাপা না হয়, তবে আর বাড়ি ফিরবে না, ট্রেনে করে শহরে চলে যাবে, নয়ত অন্য কোনোখানে। ফেল করা মুখটা আর মা-বাবা ছোটোভাইকে দেখাবে না সে। পথ যেনো ফুরোয় না। অনেক জোরে হাঁটতে চায় রতন। কিন্তু তার পা যেনো চলতে চায় না। কী হয়েছে রতনের। রতন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে। কোনো জবাব আসে না ভেতর থেকে। চোখে মুখে ঝাঁপসা দেখে। অনেক দূর চলে আসে রতন। আর অল্পকিছু পথ, পা চালায়। অনেকের হাতে হাতে পত্রিকা দেখতে পায়। আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে রতন পটিয়া থানার মোড়ে পৌঁছায়। পত্রিকার কোনো হকার নেই। কেউ বলছে এদিকে গেল, কেউ বলছে ওদিকে গেল। রতন একবার শহিদ সবুর রোডের দিকে এগিয়ে যায়, আবার থানার সামনে দিয়ে কলেজের দিকে যায়। হকার খুঁজে পায় না। কয়েক মাইল পথ হেঁটে এসে যত না ক্লান্ত হয়েছে, পত্রিকার হকার খুঁজতে তারচেয়ে মনে হয় অনেক বেশি পথ হেঁটেছে রতন। শেষে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। দাঁড়িয়ে মুখের ঘাম মুছে আর ভাবে, পত্রিকা কি কিনতে পারবে না সে? একটু জিরিয়ে আবার পোস্ট অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করে। কিছুদূর যেতেই হকারের ডাক শুনতে পায় রতন। আদালতের ভেতর থেকে পত্রিকা নিয়ে বেরোয় হকার। ছুটে গিয়ে পত্রিকা নেয় একটা। ওখানেই দাঁড়িয়ে চোখ রাখে পত্রিকায়।
কুমিল্লা বোড, মানবিক-এর রেজাল্ট খুঁজে ডুবুরির মতো। এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে ছাপা খালি চোখে যেনো পড়াই যাছে না। ঘামে তার টি-শার্ট ভিজে গেছে। কপাল বেয়ে ঝরঝরে ঘাম ঝরছে। প্রথম বিভাগে তো থাকার কথাই না। দ্বিতীয় বিভাগেও নেই। তৃতীয় বিভাগে জোনাক-পোকার আলোর মতো চোখের আলো জ্বেলে রোল নম্বর খুঁজে রতন। হ্যাঁ, তার নম্বার তো! সত্যি কি-না! আবার দেখে। বারবার দেখে শিউর হতে চায় রতন। বারকয়েক দেখার পর সে নিজে চূড়ান্ত করে, তৃতীয় বিভাগে মানবিকে তার নম্বর ছাপা হয়েছে। সে পাশ করেছে। এসএসসি পাশ করেছে রতন।
মা আমি পাশ করেছি, মা আমি পাশ করেছি বলে জোরে চিৎকার করে ওঠে রতন। পাশের ঘর থেকে মা ডেকে উঠে রতন রতন, কী হয়েছে। কী হয়েছেরে বাবা? হ্যারিকেনটা অনেক আগে নিবে গেছে। মা অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেয়ে বাতি জ্বলে। রতনের যেনো ঘোর কাটে। মা কিছু না।
কী হয়েছে বাবা, কী হয়েছে বল। কোনো স্বপ্ন দেখছিলি নাকি? না মা। আমি ঠিক আছি। বাবাও ঘুম থেকে উঠে আসে, মা-ছেলের চেঁচামেচি শুনে।
কদিন ধরে রতন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে, সে অনেক টাকা পায়। টাকায় টাকায় ভরে যায় তার ইশকুলব্যাগ। ব্যাগের ভেতর আর জায়গা নেই। কেউ জানে না তার টাকার খবর। এ টাকা দিয়ে সে কী করবে? ভেবে পায় না। তার কতকিছু করতে মন চায়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একদিন বিকেলে ইশকুলের মাঠে গিয়ে দেখে তার বন্ধু কামাল, বাবু ও হাসমত। তাদের ডেকে নিয়ে যায় বাজারের বড়ো চায়ের দোকানে। অর্ডার করে মোগলাই আর ঠান্ডা কোক। কামাল বলল, কিরে রতন টাকা পাইলি কই? কোন জবাব দেয় না রতন। শুধু মুচকি মুচকি হাসে। হাসমত বলল, ভাই অর্ডার তো করলে আমরা কিন্তু খেয়ে আগে বেরিয়ে যাব। তুমি বিল দিয়ে পরে আসবে। বাইরে আমরা দাঁড়াব। বাবুও সায় দেয় হাসমতের কথাতে।
কামাল আবার বলে, দেখ রতন, ফাজলামি করবি না। একশত টাকার বেশি বিল আসবে। আমাদের কাছে কিন্তু কোনো টাকা নেই। রতনের তাতেও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হোটেল-বেয়ারা গরম গরম মোগলাই নিয়ে আসে। রতন তাকে তাড়া দেয়, এই ঠান্ডা কোক কই। মোগলাইয়ের সাথে কোক দিতে বলছি না। বস আনতাছি বলেই বেয়ারাটা ছুটে যায়। বন্ধুরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রতনের দিকে। এদিকে গ্রামের অনেকে বাজারে আসছে। কেউ কেউ চায়ের দোকানে রতনকে বন্ধুদের সাথে দেখে অবাক হয়। কেউ কিছু বলে না। দু-একজন এমন দৃষ্টিতে তাকায় রতনের দিকে, রতন তাদের দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তবে একটুও ঘাবরায়নি। লোকগুলো যদি রতনের বাবাকে বলে দেয়? সে ভয় রতনের নেই।
কামাল আস্তে আস্তে মুখে দেয় গরম মোগলায়। সাথে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ কুচি দেয় বেয়ারাটা। গ্রামের বাজারের দোকানে মোগলায় তেমন অর্ডার হয় না। যারা মোগলাই অর্ডার করে বেয়ারারা মনে করে, তারা পয়সা খরচা লোক। বকশিশ পাবে নিশ্চিত। তাই একটু সালাত-টালাত দিয়ে কাস্টমারের মন যোগাতে চায়। তাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অল্প বয়সের চোকরা বয়টা দু-তিনবার এসে ‘বস’ আর কিছু লাগবনি, লাগলে কইয়েন?
খাওয়া শেষে হাসমত তাড়াতাড়ি উঠে পরে। কালাম হাত ধোয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেল। বাবু নির্বিকার। সে এমনিতেই একটু গম্ভীর টাইপের। তবে তার মনটাও রতনের মতো উদার। তার মধ্যে আত্মসম্মানটাও আছে আর কি। সে মনে মনে ভাবে রতনের যদি বিলের সব টাকা না থাকে তবে তার কাছে বিশ-ত্রিশ টাকার মতো আছে খাতা কেনার টাকা। বাড়ি থেকে নিয়ে আসছিল। তা দিয়ে দেবে। চোকরা টাইপের বেয়ারাটা এসে বলল বস ৯০ টাকা। ৯০ টাকা বিল। রতন কোনো কথা না বলে ম্যানিবাগ থেকে কচকচে একশত টাকার একটা নোট বের করে বেয়ারার হাতে দেয়। বাবুর চোখ যেনো চড়কগাছ। ও বাবা! রতনের কাছে এমন নতুন নতুন নোট এলো কোত্থেকে? মনের ভেতর প্রশ্নটা উথাল-পাতাল করছিল। ওরা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই বেয়ারাটা দশ টাকার একটা নোট ফেরত নিয়ে আসে ক্যাশ থেকে। রতন তাকে রাখতে বলে সামনের দিকে পা বাড়ায়। বেয়ারাটা এবার সালাম দিয়ে ‘স্যার আবার আইসেন’। চাইনিজ খাবারও আছে আমাগো হোটেলে। রতন আর বাবু হাসতে হাসতে দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কামাল আর হাসমতকে খুঁজতে থাকে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠে রতন রাতের স্বপ্নটা মনে করে আর বার বার হাসতে থাকে। মনে মনে হাসে আর ভাবে, সত্যি যদি আমি অনেক টাকা পেতাম? আমাদের গরিবি অবস্থার পরিবর্তন করতে পারতাম! বাবার কষ্ট আর মার কষ্ট লাগব করতে পারতাম!
মা জাও ভাত রান্না করেছে। মরিচ পোড়া দিয়ে খেতে দেয়। রতন জাও ভাত গিলে আর রেজাল্টের কথা ভাবে। খেতে দেরি হছে দেখে মা তাড়া দেয়, রতন ছাগল-দুটো পুকুর পাড়ে চড়তে দিয়ে আইছি, একটু দেখে আয় তো বাবা। তারপর বাবার জন্য খাওনটা দিয়ে আইছ। রতন চুপচাপ গিলে যাছে আর ভাবছে।
রতনের উদাস ভাব দেখে মা কিছ্ইু ভেবে পায় না। পরীক্ষার পাশ নিয়ে যে রতন ভাবনায় আছে তা মা জানে। কিন্তু ছেলের এমন কষ্টে কী বা করবে মা। মা শুধু ঠাকুর-দেবতাকে স্মরণ করে আর ছেলের পাশের জন্য আশীর্বাদ কামনা করে। মাঝে মাঝে মা-ছেলের মঙ্গলের জন্য ব্রত পালন করে। মন্দিরে পুজো দেয়। রতন যেনো অথৈই নদীর জলে ভাসা পদ্ম। কোন কূলে যাবে ভেবেই পাছে না। তার সরল মন কতই ভাবছে।
বিকেলে গ্রামের চায়ের দোকানে একটু ভিড় হয়। গাঁয়ের মানুষ কাজকাম শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দশজনার খবরা-খবর নেয়। রতনের বাবার দোকানে তাই চাপ থাকে। এ জন্য বিকালটা প্রায় রতন বাবার সাথে থাকে। বাবাকে সাহায্য করে। সন্ধ্যার পর যখন কচুপাতার রং ধরে রাতের আঁধারটা ধিরে ধিরে নামে, রতনও বাড়ির পথে পা বাড়ায়। বড়ো রাস্তা পার হয়ে আলপথে যখন নামছিল রতনের চোখে পড়ে একটি মানিব্যাগের মতো জিনিস। রতন নেবে কি নেবে না ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিকও চায়। কেউ কোথাও আছে কি-না। তাকে কেউ তো পরীক্ষাও করতে পারে।
কয়েকমিনিট চারদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে হাতে নিয়ে দেখল সত্যি একটি মানিব্যাগ। ভেতরে সব কচকচে নতুন টাকার নোট। এতটাকা একসাথে দেখতে পেয়ে শরীরে কাপুনি ধরে যায় রতনের। সে কী করবে এখন? কাউকে বলবে কি-না? বললে আবার কে কীভাবে। এসব ভাবনায় রাতে ঘুমই হয়নি। রতন কি করবে টাকাগুলো। যে করেই হোক মালিককে সে খুঁজে বের করবেই। হঠাৎ তার মাথায় আসে সকালে সে মেম্বারের কাছে যাবে, তাকে নিয়ে থানায় ব্যাগটা জমা দেবে। থানার দারোগা সাহেব মানিব্যাগের মালিককে খুঁজে বের করবে। একটা সমাধান খুঁজে পেয়ে মনে মনে খুশি হয় রতন। এখন আর মনে কিছু নেই।
থানায় গিয়ে ওসি সাহেবের রুমে প্রবেশ করে মেম্বার। সাথে রতনও আছে। রতনের মুখে সব কথা শুনে। মেম্বারও রতনের পরিবারের অবস্থা তুলে ধরে ওসি সাহেবের কাছে। ওসি সাহেব মানিব্যাগ ভালো করে খুঁজে দেখে আট হাজার টাকা রয়েছে। কিছু খুচরা টাকাও আছে। তবে কোনো ভিজিটিং কার্ড বা কোনো ফোন নম্বার না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। মানিব্যাগের মালিককে খুঁজবে কোথায়? রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ওসি। তিনি সেন্টিকে ডেকে রতনের জন্য মিষ্টির অর্ডার করে। ওসি সাহেব বললেন তোমাদের আর্থিক অবস্থা তো ভালো নয়, এই টাকা তুমি তো রেখে দিতে পারতে। রতন বলল, ছিঃ, ছিঃ, ওসি সাহেব, কী বলেন। যার টাকা হারিয়েছে সে তো আমাদের চেয়ে আরো গরিব হতে পারে। হয়ত তার কোনো জরুরি প্রয়োজনে টাকা নিয়ে যাছিল। হারিয়ে এতক্ষণে তার যে কী অবস্থা সেটা একবার ভাবুন না! হতে পরে তার পরিবারের কেউ অসুস্থ। হাসপাতালেও থাকতে পারে। টাকাটা তার খুবই দরকার। আপনারা দ্রুত ব্যবস্থা নিন টাকাগুলো ফেরত দিতে। ওসি সাহেব বিস্মিত হয়ে যান। এ যুগে এমন ছেলেও পাওয়া যায়? মেম্বার ওসি সাহেবকে বলেন, রতন আমাদের গ্রামে খুব ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত, তার স্বপ্ন লেখাপড়া করে অনেক বড়ো হওয়া। পরের জিনিসের ওপর কখনো তাকায় না। রতনের মা-বাবাও পরিশ্রম করে সাংসার নির্বাহ করে। কারো দানের প্রত্যাশা করে না।
ওসি সাহেব বারবার রতনের মুখের দিকে তাকায়। তার চাকরি জীবনে কত চোর-বাটপার, ডাকাত, সন্ত্রাসী ধরেছে। কত ভদ্রলোককে শত্রুতা বশত মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে দেখেছে। কিন্তু রতনের মতো এমন বালক কখনো চোখে দেখেনি। রতনকে দেখে তার পুণ্যি মনে করছে। এমন নিস্পাপ বালকের সাক্ষাৎ পাওয়াকে ধন্য মনে করছে। তার মনে পড়ে যায়, ঢাকায় একটি থানায় সেকেন্ড অফিসার থাকতে রতনের বয়সের একটা ছেলেকে সে গ্রেফতার করে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল প্রতিবেশী একজনের। একটি ঘড়ি চুরির ঘটনা। ছেলেটার পরিবারও খুবই দরিদ্র। ঠিক রতনের পরিবারের মতো। কিন্তু ছেলেটি প্রাইমারি পর্যন্ত পড়ে আর পড়তে পারেনি। কিন্তু কারো কোনোকিছুর উপর কখনো লোভ করেনি। গ্রামের মেম্বারকে টাকা দিয়ে দরিদ্র পরিবারটিকে শায়েস্তা করার জন্য ঐ ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। সারারাত এবং পরদিন সারাদিন ছেলেটিকে থানা হাজতে বসিয়ে রেখেছিল। ঘড়ি চুরির দায় স্বীকার করানোর জন্য তাকে মারধারও করা হয়েছিল মেম্বারের কথা ধরে। কিন্তুু ছেলেটি সত্যিই চুরি করেনি। ওসি সাহেব ঘটনাটির কথা মনে করে বারবার রতনের মুখের দিকে তাকায় আর নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে থাকে।
স্যার মিষ্টি খান। সেন্ট্রি ওসি সাহেবের রুমে মিষ্টি নিয়ে আসে। ওসি সাহেব মিষ্টির প্লেটটা নিজের হাতে রতনের দিকে এগিয়ে দেয়।
রতন মিষ্টি মুখে দিয়ে মেম্বারকে তাড়া দেয়। তার আর ভালো লাগছে না। তার যে রেজাল্ট আসছে। কোথাও কিছু আর ভালো লাগছে না। কেউ কোনো কথা বললে তার কাছে বিষের মতো লাগছে। কেন যে এমন লাগছে তাও জানে না। মেম্বার রতনের তাড়া খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। ওসি সাহেব আরও কিছু খাওয়ার জন্য রতনের প্রতি অনুরোধ করে। রতন সালাম দিয়ে বেরিয়ে আসতে পেছন ফিরলেই ওসি সাহেব রতনকে থামায়। এগিয়ে এসে দুটো পাঁচশত টাকার নোট তার পকেটে ভরে দেয়।
কী করছেন স্যার, কী করছেন?
না এটা তোমাকে রাখতে হবে। আমি খুশি হয়ে তোমাকে দিলাম। আর মানিব্যাগের মালিককে খুঁজে পেলে তোমাকে খবর দেব। তখন একবার এসো।
স্যার আমার টাকা লাগবে না। আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন।
ওসি সাহেব রতনকে বলে এটা আমার দেওয়া তোমার জন্য উপহার। তুমি একদিন অনেক বড়ো হবে। আর তোমার রেজাল্ট বেরুলে আমাকে জানাবে। ভালো থেকো।
মেম্বার এ সময় রতনকে টাকাগুলো রেখে দিতে বলে, ওসি সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে থানা থেকে।
গ্রামে পৌঁছে মেম্বার রতনের ব্যাপারটা সবাইকে জানায়। রতনের এমন সততার জন্য তার প্রতি গ্রামের মানুষের আরো স্নেহ বেড়ে যায়। রতনের বাবাকেও সবাই ছেলের গর্বের জন্য ধন্যবাদ জানায়।
চলবে…
সাম্প্রতিক লেখা
অদম্য কিশোর : শিবুকান্তি দাশ
0
Previous Articleছদ্মবেশী : শারমিন প্রিয়া
এ বিষয়ে আরও লেখা
Add A Comment

