নিজের খেয়ে নিজের পরে নিজে বাঁচি, এখানে অন্যকে তোয়াক্কা করা নেহাত বোকামি, আর যেহেতু আমি নিজেই একজন স্বাবলম্বী আত্মনির্ভরশীল মানুষ সেখানে অন্যের কথা ভাবা বা নিজেকে ছাড়া অন্যকে নিয়ে কিছু করা সময় অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। এমন ধারনা আমাদের অনেকেরেই আছে। ঘটনা কিছুটা সত্যি, কিন্তু তার পরেও কিছু বিষয় থাকে, যা নিজেকে ছাড়িয়ে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র এবং সামগ্রিক ভাবে সকল দেশের সকল মানুষের হয়ে যায়, সকল মানুষের কথা বিবেচনা করেই করতে হয় ।
একটু খেয়াল করে দেখুন, আমরা আমাদের স্মৃতিতে নিজেকে যতটা সংরক্ষিত রাখি তার থেকেও বেশি সংরক্ষিত রাখি অন্য কাউকে বা অন্যদেরকে। কথাটা আরও একটু পরিষ্কার করে বললে এভাবে বলা যেতে পারে যে, আমাদের অল্পায়ুর জীবনে যে জীবন চিত্র থাকে স্মৃতিতে সেই জীবন চিত্রের পুরোটা জুড়েই নিজের পাশাপাশি থাকে অন্যকেও অন্য অনেকেই। এই অন্যকেও অন্য অনেকেই কে আমরা বিভিন্ন শ্রেণিতে সারিবদ্ধ করে রাখি, যে যেই ভাবে তারা আমাদের জীবনে এসেছে, তাদের আচরণ, তাদের কাজ আর ব্যাবহারের মাধ্যমে আমাদের জীবন যাপনে উপস্থিত হয়েছে, তাদের সেই কাজ,কর্ম আর ব্যাবহারের মাধ্যমে তারা মূল্যায়িত হয়ে আমাদের স্মৃতিতে আপনা আপনি সংরক্ষিত হয়ে আছে সেই বিভিন্ন শ্রেণির কোন একটি শ্রেণিতে। এই কারণেই আমরা আমাদের জীবন ভর এই অগণিত বা অনেক মানুষ গুলোর মধ্য থেকে কাওকে ভালো হিসেবে বিবেচনা করি, কাওকে করি মন্দ হিসেবে, আবার কাউকে কিছুই না, এই বিবেচনাই তাদের মৃত্যুতে আমাদের ভেতর থেকে তাদের প্রতি সন্তুষ্টি আসে, আফসোস আর নিরপেক্ষতা প্রকাশ পায়। ঠিক একই ভাবে আমারাও আমাদের পরিচিত বা অপরিচিত মানুষদের মাঝে আমরা তাদের স্মৃতিতেও এই একেই ভাবে আছি, আমাকেও তারা আমাদের মতো ভালো, মন্দ বা নিরপেক্ষতার সারিতে রেখেছেন আমাদের আচার ব্যাবহার আর কাজের জন্য, আমাদের মৃত্যুতেও তারা আমাদের মতোই যোগ্যতা অনুযায়ী আবেগ প্রকাশ করে আমাদের প্রতি, মনে রাখে ভালোবাসা ও ঘৃণার মাধ্যমে। এই কারণেও আমাদের ভালো মানুষ হওয়া উচিত ।
আমরা প্রতিদিন যাদের সঙ্গে স্কুল, কলেজ, ভাসিটি আর কর্মস্থলে আসা যাওয়া করি, থাকি, প্রয়োজনে কথা বলি, এক সঙ্গে কাজ করি, আমাদের মৃত্যুর পর তারা কি ভাবে আমদেরকে নিয়ে কথা বলবে, তার কথা আমাদেরকে ভাবতে হবে। যদিও আমারা আমাদের মেধায়, যোগ্যতায় আর আমাদের পরিশ্রমে আমরা বড় হয়েছি তাদের এখানে কোন ভূমিকা নেই, তার পরেও তাদের বিবেচনায় আমরা কেমন মানুষ সেই হিসেব করেই আমাদেরকে আমাদের জীবনের কাজগুলো করতে হবে, যদি আমরা প্রশংসিত হতে চাই, পৃথিবীতে ভালো মানুষ হয়ে জীবিত থাকতে চাই,আর মৃত্যুর পর স্বর্গের মত চির শান্তির জায়গায় যেতে চাই, তবে তো আমাদের তা করতেই হবে। আর যদি আমরা শূন্যবাদে বিশ্বাসী হই তাহলে-তো কথাই নে,ই, মৃত্যুর পর আমাদের দেহ গলে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, আমাদের প্রাণ বলে কিছুই থাকবে না তখন, তখন এই পৃথিবীতে কে কি বললো আমাদের নিয়ে তখন তাতে আমাদের কি আসে যায় না? কে আমাকে ভালো বললো, আর কে মন্দ বললো তাতে আমার কিছুই আসে যায় না, যেহেতু আমি তখন থাকবই না এই পৃথিবীতে, শুনবও না কারো কথা।
আছা আপনি একটু ভেবে দেখুনতো, এই পৃথিবীতে আমরা কি শুধু মাত্র কয়েকদিন বেঁচে থাকার জন্যই এসেছি? যতদিন বাঁচবো ততদিন মন যা চায় সেই স্বেছাচারী জীবন যাপনেই কি আমাদের উদ্দেশ্য ? যদি এমন হয়, তাহলে আমাদের আর পশুর মাঝে কোন পার্থক্য রইলো না, পশুরা মরে গেলে তাদেরকে কেউ মনে রাখে না, তাদের কোন নাম থাকে না কখনো, তাদের মৃত্যুর পর কেউ তাদের নিয়ে আলোচনাই করে না, অথচ মানুষের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে আলোচনা হয়, এই কারণেই আমাদের সেই আলোচকদের কথা ভেবে প্রতিটি কাজ করে যেতে হবে এই পৃথিবীতে। আমার মৃত্যুর পর পরিচিত-জনেরা যদি আমাকে মন্দ বলে, যতদিন আমার নাম পৃথিবীতে থাকবে ততদিনেই আমার নামের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের ঘৃণা আর তাছিল্য থাকবে, তারা ঘৃণা ও তাছিল্য নিয়ে উচারণ করবে সব সময় আমাদের নাম, স্মরণ করবে আমাদের জীবনী, আমার পৃথিবীর পরিচয় হবে নষ্টা জন্ম, আর আমার প্রজন্মকে আমার এই নষ্টা জন্মের কারণে পৃথিবীর মানুষ গুলোর ঘৃণার তিক্ত ব্যাবহারে উপর বাচতে হবে যতদিন তারা জীবিত থাকে, আমার স্বেছাচারিতার অপরাধের বোঝা অযথা বয়ে বেড়াতে হবে আমার নির্দোষ প্রজন্মকে ।
আর নগদ হিসেব করলে, বলতে হয়, আমাদের জীবন যাপনের ক্ষেত্রে আমরা নানা বিষয়ের ও অবস্থার মুখোমুখি হই, সেই অবস্থা গুলোর কোন কোনটি আমরা নিজে নিজে একা কখনোই মোকাবেলা করতে পারি না, সমাধান করতে পারি না অন্যের সহযোগিতা ছাড়া, আমরা অসহায় হয়ে যাই তখন, এই অন্যের সহযোগিতার জন্যই অন্যের সঙ্গে ভালো কিছু করতে হবে আমাদের। কারণ তার জীবনে যদি আমার দ্বারা কোন উপকার হয়, সে অকৃতজ্ঞ না হলে সে অবশ্যই আমার বিপদের সময় পাশে থাকবে চেষ্টা করবে আমার। আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে আমাকে উদ্ধার করতে চাইবে। আর আমার কোন প্রভাবও যদি তার জীবনে না থাকে, আমার পৃথিবীর জীবন যদি অপরাধ মুক্ত থাকে, এই অপরাধ মুক্ত থাকার কারণে কেউ নয়তো কেউ আমার পাশে থাকবেই আমার বিপদের সময়। এই কারণেই আমাদের ভালো মানুষ হতে হবে, স্বেছাচারী হলে চলবে না।
আপনি আর আমি আমরা সবাই জানি মানুষ সামাজিক প্রাণী, সমাজ ছাড়া আমাদের বেচে থাকা প্রায় অসম্ভব, আর আমরা যেই সমাজে বসবাস করি সেই সমাজে থাকে ভিন্ন ভিন্ন মনের, ভিন্ন ভিন্ন আচরণের আর বিভিন্ন শ্রেণির মানুষজন। আপনি ভালো করে একটু খেয়াল করে দেখবেন যে, সমাজে বসবাসরত সেই মানুষগুলোর পেশা, তাদের আচরণ ও যোগ্যতার বিচারেই তারা তাদের সামাজিক জীবনে মূল্যায়িত হয়ে থাকে। আর আমি আর আপনি আমরা যেহেতু সেই সমাজেরেই একজন মানুষ তাই স্বভাবতই আমরাও আমাদের আচার আচরণ আর যোগ্যতার খাতিরেই আমার আপনার স্থান হবে আমি আপনি আমরা সমাজের কোন স্তরে আসন পেতে পারি। এই কারণেই নিজের খেয়ে নিজের পড়ে বেঁচে থাকলেও অন্যান্য সকলের কথা বিবেচনা করে আমাদের প্রতিটি কাজ করতে হবে, তা না হলে আমাদের জন্ম হয়ে যাবে নষ্টা জন্ম। আমরা সমাজের ঘৃণিত স্তরের নষ্ট মানুষের খেতাব নিয়ে এই পৃথিবীর জীবন থেকে বিদায় হবো খুব অপমানিত হয়ে।

