প্রতিদিনের মতো আজও সকালে দোকানে যাওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ডাইনিংরুমে আমজাদ সাহেব নাস্তা করতে বসেছেন। এসময় হঠাৎ বাসার কলিংবেল বেজে ওঠে।
দেখ তো মা, এখন আবার কে এলো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে আমজাদ বললেন।
ড্রইংরুমে গিয়ে বাসার সদর দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই বড় ভাইকে দেখে তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে সোনিয়া বলল,
‘আরে, ভাইয়া তুই! একটু থেমে গলার ভলিউম খানিকটা বাড়িয়ে পুনরায় সে বলল, ‘বাবা, ভাইয়া এসেছে।’
‘তোরা সবাই কেমন আছিস?’ সদর দরজা পেরিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকে সাব্বির জানতে চাইলো।
‘আমরা সবাই ভালো আছি।’ আস্তে করে সোনিয়া বলল।
সোনিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে ড্রইংরুম পেরিয়ে সাব্বির ডাইনিংরুমে চলে আসে। ছেলে কে দেখে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে আমজাদ বললেন, ‘এই অসময়ে ঢাকা থেকে আসলি যে। কোন সমস্যা হয়নি তো?’
‘তোমার কি কোন দিনই বুদ্ধি-শুদ্ধি হবে না? ছেলেটা সারা রাত জার্নি করে বাসায় ফিরেছে। আগে তো তাকে ফ্রেশ হয়ে নাশতা খেতে বলবে তা না, পুলিশের মতো জেরা শুরু করতে শুরু করেছো।’ রাগি গলায় সালমা বানু বলল।
পরক্ষণেই ছেলের দিকে তাকিয়ে পুনরায় তিনি বললেন, ‘বাবা যা তো আগে ফ্রেশ হয়ে আয়।’
কথাটা বলে তিনি থামতেই গম্ভীর গলায় সাব্বির বলল, ‘সেই ভালো। চট করে একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। তোমাদেরকে আমার কিছু কথা বলার আছে।’
বাইরের কাপড় বদলে ভালো ভাবে ফ্রেশ হয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে ডাইনিংরুমে এসে প্রথমে ধীরে সুস্থে নাস্তার পর্ব শেষ করে এরপর স্বাভাবিক কণ্ঠে সাব্বির বলল, ‘আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।’
‘কি বললি! তুই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস?।’ ছেলের কথাটা মানতে আমজাদের যেন অনেক কষ্ট হয়।
‘হ্যাঁ, বাবা।’ নিরুত্তাপ ভাবলেশহীন কণ্ঠে সাব্বির বলল।
‘কাজটা তুই মোটেও ভালো করিসনি। চাকরির বাজার দিন দিন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রথম শ্রেণি তো অনেক দূরের কথা, সামান্য পিওনের চাকরির জন্য লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে দিনরাত এক করে যেখানে পড়াশোনা করছে, সেখানে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিটা ছেড়ে তুই চলে এসেছিস।’ আমজাদের কণ্ঠে খানিকটা হতাশার সুর।
‘আরে, তুমি থামো তো। আগে চাকরি ছাড়ার কারণটা তো শোনা দরকার।’ স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু ঝাঁজের সাথে সালমা বলল। এরপর ছেলের দিকে তাকিয়ে গলার সুর নরম করে পুনরায় তিনি বললেন, ‘এবার বলতো কেন তুই চাকরিটা ছেড়ে দিলি?’
‘আসলে আমি যে চাকরিতে ছিলাম, সেটা নিঃসন্দেহে খুব ভালো একটা চাকরি, কিন্তু এই চাকরি করলে পরকালে আমাকে কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে এবং আমার সেই আজাবের ভাগ নেওয়ার জন্য কেউই এগিয়ে আসবে না। এমনিতেই চলার পথে প্রতিদিন অজান্তে কত পাপ যে করছি তার কোন হিসাব নেই, তার উপর জেনেশুনে আমি আর পাপের বোঝা বাড়াতে পারবো না। এই পাপের কাজে লিপ্ত থেকে সমাজের আর দশজনের মতো আমি নিজেও হয়তো অনায়াসে অনেক টাকা আর বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে যেতে পারতাম, কিন্তু মৃত্যুর পর এগুলোই কয়েক হাজারগুণ আজাব হয়ে অন্ধকার কবরে প্রতিনিয়ত আমার নিকট হাজির হবে। শুধু আমি একা নই, আমার সাথে সাথে তোমাদেরও কবরে এই অসহ্য ও কঠিন থেকে কঠিনতর আজাব ভোগ করতে হবে। এখন তোমরা আছো, দুদিন পর আল্লাহ চাইলে আমার স্ত্রী ও সন্তানাদি হবে। আমি কখনোই চাই না আমার এই পাপ রক্ত ও মাংস তোমাদের সবার শরীরে বাসা বাঁধুক…আমি চাই না আমার মতো তোমরাও এক একটা পাপের কলুষিত মাংসপিণ্ডে পরিণত হও। তাই আমি অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ভরাট গলায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সাব্বির একটু থামলো। সে থামতেই তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় আমজাদ বললেন, ‘তুই ভেঙে না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি, তুই কোন পাপের কথা বলতে চাচ্ছিস?’ কিন্তু এসব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেও তো তুই চাকরিটা করতে পারতি?’
‘আমি সেই চেষ্টাও করেছি। কিন্তু তাতে লাভের থেকে ক্ষতিই হয়েছে বেশি। ন্যায়ের পথে থাকতে গিয়ে আমি অফিসের সবার চক্ষুশূল হয়েছি। তারপরও শেষ একটা চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি বিধায় গতকাল অফিসে রেজিগনেশন লেটার সাবমিট করে রাতের বাসে চলে এসেছি।’ খানিকটা থমথমে গলায় সাব্বির বলল।
‘তোর জীবনের উপর দিয়ে এতো ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেলো। সব কষ্ট আর যন্ত্রণা তুই একাই সহ্য করলি, কিন্তু একবারের জন্যও আমাদেরকে কিছু বললি না কেন ভাইয়া? আমরা না তোর আপনজন?’ সোনিয়া এতক্ষণে মুখ খুললো।
‘একবার ভেবেছিলাম তোমাদের সাথে এই ব্যাপারটা শেয়ার করবো, কিন্তু পরে আর ইচ্ছা করেই তোমাদেরকে কিছু জানাইনি। এসব শুনে তোমরা শুধু শুধু কষ্ট পেতে।’ বাবার দিকে তাকিয়ে মুখটা সামান্য কালো করে সাব্বির বলল।
‘তাহলে এখন কি করবি সেটা কিছু ঠিক করেছিস।’ একটু চিন্তা করে আমজাদ বললেন।
‘হ্যাঁ বাবা ঠিক করেছি।’ আস্তে করে সাব্বিরর বলল।
‘কি ঠিক করেছিস?’ গভীর আগ্রহের সাথে আমজাদ জানতে চাইলেন।
‘ঠিক করেছি, এখন থেকে তোমার সাথে দোকানে বসবো আর টিউশনির চেষ্টা করব। যদি কয়েকটা টিউশনি পাই, তাহলে তখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসবো এবং সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করব।’ আপন মনে সাব্বির বলল।
‘তুই কি ভেবে চিন্তে এসব কথা বলছিস?’ একটু চিন্তা করে আমজাদ জিগ্যেস করলেন।
‘হ্যাঁ, বাবা। আমি সুস্থ মস্তিষ্কেই ভেবে চিন্তে কথাগুলো বলেছি।’ দৃঢ় কণ্ঠে সাব্বির বলল।
‘তুমি কি বলো, ছেলে কি কাল থেকে আমার সাথে দোকানে যাবে?’ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আমজাদ জিগ্যেস করলো।
‘আমি আর কি বলবো। তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো।’ মুখ সামান্য কালো করে সালমা বললো।
‘মা, তুমি কি আমার সিন্ধান্তে খুশি হওনি?’ মায়ের দিকে তাকিয়ে সাব্বির জিগ্যেস করলো।
‘কিভাবে খুশি হবো তুই বল তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। যদি মেয়ের বাবা শোনে তুই সরকারি চাকরি ছেড়ে এখন দোকানে বসবি, তাহলে কি সেই ভদ্রলোক নিজের মেয়েকে তোর সাথে বিয়ে দিতে চাইবে?’ করুণ কণ্ঠে সালমা বললেন।
‘না দিলে না দিবে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’ ভাবলেশহীন কণ্ঠে সাব্বির বলল।
‘তুই ব্যাপারটা সিরিয়াসলি না নিলেও আমাকে তো অনেক কিছু ভাবতে হয়। সেই ভদ্রলেকের কথা না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু ভালো কোন চাকরি না করলে কোন ফ্যামিলি মনে হয় না তোর সাথে তাদের মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হবে।’ একটু ভেবে সালমা বললেন।
‘এটা তো আমার সমস্যা না। এটা ওই সমস্ত ফ্যামিলির সমস্যা। আমি তো কোন খারাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছি না। বাবা বহু বছর ধরে একা হাতে লাইব্রেরির ব্যবসায়টা সামাল দিচ্ছেন। এবার আমি ব্যবসায় যুক্ত হয়ে বাবাকে হেল্প করতে চাই। চাকরি করাকালীন সময়ে খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে খাতা, কলমসহ যাবতীয় স্টেশনারী সামগ্রী আমি দোকানে উঠাতে চাই। আমি ব্যবসায় করি শুনে যদি কোন ফ্যামিলি আমার সাথে তাদের মেয়েকে বিয়ে দিতে না চায় তাহলে আমার কিছু করার নাই। তাছাড়া, ছোট একটা ব্যবসায় আছে জানার পরও নানা তোমার সাথে বাবার বিয়ে যখন দিয়েছে, তখন শুধু ব্যবসা করব দেখে বিয়ে করার ক্ষেত্রে আমার জীবনেও কোন প্রতিবন্ধকতা আসবে না ইনশাআল্লাহ।’ দৃঢ়কণ্ঠে সাব্বির বলল।
‘এখন কি আর সেই যুগ আছে? যুগ বদলে গেছে না।’ একটু ভেবে সামলা বললেন।
‘আমিও জানি যে যুগ বদলে গেছে। কিন্তু যুগ যতই বদলে যাক, সব যুগেই আমার নানার মতো ভালো মানুষ রয়েছে, যারা মেয়ের জামাই করার ব্যাপারে শুধু ছেলের শিক্ষাগত যোগ্যতা আর পেশা দেখে না, দেখে ছেলেটা মানুষ হিসাবে কেমন, ছেলের ফ্যামিলি কেমন এবং অল্প হলেও ছেলে সৎ পথে টাকা রোজগার করে কিনা।’ সাব্বিরের কণ্ঠে পুনরায় খানিকটা দৃঢ়তার সুর।
‘ভাইয়া তো ঠিকই বলছে। মা, তুমি আর অমত করা না।’ অনেকক্ষণ বাদে সোনিয়া আবার মুখ খুললো।
‘যে ছেলে ব্যবসার কথা শুনলেই দৌড়ে দশ হাত দূরে চলে যেতো, সেই ছেলেই যখন চাকরি ছেড়ে ব্যবসার হাল ধরতে চাইছে, সুতরাং আমার মনে হয় তাকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। ও যদি একবার ব্যবসার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সব ঠিকমতো বুঝতে পারে, তাহলে আশাকরি অদূর ভবিষ্যতে আমার অবর্তমানে এই ব্যবসায়কে আরো সমৃদ্ধশালী করতে পারবে।’ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ভরাট গলায় আমজাদ বলল।
‘ঠিক আছে, ছেলেকে কাল থেকে দোকানে নিয়ে যেও।’ ঠান্ডা গলায় সালমা বললেন।
এক সপ্তাহ পরের কথা…
শুক্রবার বিকেলের দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যাটা বাইরে কাটিয়ে সাব্বিরর যখন বাসায় ফিরে আসে তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় আটটা ছুঁইছুঁই করছে। বাসার কলিংবেল বেজে উঠতেই সকালের মতো এবারও সোনিয়া এসে সদর দরজা খুলে দেয়।
‘কি রে..ভাইয়া, বাসায় আসতে এতো দেরি করলি কেন? তোর অফিস কলিগ আশিক ভাই বিকেলে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। সারাটা বিকেল তোর জন্য অপেক্ষা করে শেষে সন্ধ্যার পরপরই চলে গেছেন। তুই বাসায় নেই দেখে তোকে কয়েকবার ফোনও করেছিল।’ সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গড়গড় করে সোনিয়া বলল।
‘ও আচ্ছা।’ সদর দরজা পেরিয়ে ড্রইংরুমে পা রেখে সাব্বির বলল।
‘আশিক ভাই বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবা মা দুজনই নিজেদের রুমে ঝিম মেরে বসে আছে। আমি একবার কথা বলার জন্য রুমে যেতেই মা আমাকে কড়া ভাষায় ধমক দিয়েছে।’ মুখ কালো করে সোনিয়া বলল।
‘কেন? আশিক তাদের কাছে কি বলেছে?’ সোনিয়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সাব্বির জিগ্যেস করলো।
‘আমি তো এ ব্যাপারে কিছু জানি না। আসলে বিকালে আমি বাসায় ছিলাম না। স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলাম। প্রাইভেট পড়া শেষ করে সন্ধ্যার সময় আমি যখন বাসায় ফিরে আসি, ঠিক তখন সদর দরজার মুখে আশিক ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হয়।’ বাবা মায়ের সাথে কথা শেষ করে ভাই তখন বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, আমতা আমতা করে সোনিয়া বলল।
‘ও আচ্ছা।’
বাসায় ঢুকে আগেই বাবা মায়ের বেডরুমে না গিয়ে আগে নিজের রুমে ঢুকে ভালো ভাবে ফ্রেশ হয়ে, বাইরের কাপড় বদলে গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে এরপর বাবা মায়ের বেডরুমের দরজায় নক করে আস্তে করে সাব্বির বলল, ‘মা, ভেতরে আসবো?’
‘আয়।’ বিষণ্ন গলায় সালমা বললেন।
সাব্বির বেডরুমের ভেতরে পা রাখতেই ওকে দেখে একটু গম্ভীর গলায় আমজাদ বললেন, ‘বস, তোর সাথে আমাদের কিছু জরুরি কথা আছে।’
‘কি কথা বলতো বাবা।’ সোফায় বসে স্বাভাবিক কণ্ঠে সাব্বির বলল।
‘তুই আমাদের মিথ্যা কথা বলেছিস কেন? ভাগ্যিস আশিক আজকে আমাদের বাসায় এসেছিল, না হলে তুই যে আমাদের মিথ্যে কথা বলেছিস, সেটা আমরা কখনোই জানতে পারতাম না।’ ছেলের দিকে তাকিয়ে কাটাকাটা স্বরে আমজাদ বললেন।
‘আমি তো ইচ্ছা করেই তোমাদের মিথ্যা কথা বলেছি। বুকে হাত রেখে বলোত…যদি আমি সত্যি বলতাম, তাহলে তোমরা কি স্বাভাবিক ভাবে আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে?’ গম্ভীর গলায় সাব্বির বলল।
‘স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিব না বলেই কি তুই আমাদের মিথ্যে কথা বলবি? আমরা কি তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি?’ পাশ থেকে সালমা বললেন।
‘আশিক আমাদের সব বলেছে। তোর রেজিগনেশন লেটার অফিস গ্রহণ করেনি। তোর জন্য অফিস আরো কিছুদিন অপেক্ষা করবে। তবে ততদিন তোর দেরি করার দরকার নাই। তুই আগামীকালই ঢাকায় গিয়ে পরশুদিন থেকে পুনরায় আবার কাজে যোগ দিবি। এই ব্যাপারে তোর কাছ থেকে আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না। বয়স হলেও আমি আল্লাহর রহমতে এখনো বেশ ভালো আছি, সুস্থ আছি। আমি একাই ব্যবসা সামাল দিতে পারব।’ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বেশ জোরেই আমজাদ বললেন।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে করে সাব্বির বলল।
পরদিন খুব সকালে সোনিয়ার ক্রমাগত ডাকাডাকিতে আমজাদ সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিছানা ছেড়ে উঠে ঘুম ঘুম চোখে রুমের দরজা খুলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘কি রে মা, কি হয়েছে? এতো জোরে ডাকাডাকি করছিস কেন?’
‘ভাইয়া বাসা থেকে চলে গিয়েছে।’ মুখটা একটু কালো করে সোনিয়া বলল।
‘আমি কালকে সাব্বিরকে বলেছি ঢাকায় ফিরে পুনরায় চাকরিতে জয়েন করতে।’ স্বাভাবিক কণ্ঠে আমজাদ বললেন।
‘ভাইয়া মনে হয় তোমাকে কিছু ্বলতে চেয়েছিল।’
‘সাব্বির কি তোকে কিছু বলেছে?’
নিজের হাতে থাকা ভাঁজ করা একটা কাগজের টুকরো বাবার হাতে দিয়ে সোনিয়া বলল, ‘এটা ভাইয়ার লেখা একটা চিরকুট। তোমাকে বলতে না পারা সেই কথাগুলোই এখানে লেখা রয়েছে।’
‘এটা তুই কোথায় পেয়েছিস?’ ভাঁজ করা কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে সেটার ভাঁজ খুলতে খুলতে আমজাদ জানতে চাইলেন।
‘আমার রুমের দরজার নিচে পেয়েছি।’
‘এখানে কি লেখা রয়েছে, সেটা তুই পড়ে দেখেছিস?’
‘সবটুকু পড়িনি….শুধু প্রথম লাইন পড়েছি।’
‘গাধাটা কি লিখেছে আমাকে পড়ে শোনা তো।’ কাগজের টুকরো মেয়ের হাতে দিয়ে আমজাদ বললেন।
বাবার কথামতো কাগজে লেখা লাইনগুলো সোনিয়া পড়তে আরম্ভ করলো-
‘বাবা,
আমি তোমাকে গতকাল কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার মুখের ওপর কথা বলাটা বেয়াদবি হবে বিধায় চুপচাপ তোমাদের রুম থেকে আমি বেরিয়ে আসি। আসলে আজ থেকে মাস দেড়েক আগে এক শুক্রবার মাছ ও তরিতরকারি কেনার জন্য আমি বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারে ঢুকতেই দেখলাম প্রায় তোমার বয়সী এক ভদ্রলোক বাজার শেষ করে দু হাতে দুটো ভারী ব্যাগ নিয়ে বড় রাস্তার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। দুই হাতেই ভারী ব্যাগ থাকায়, সেই ভদ্রলোকটির হাঁটতে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। এই দৃশ্য দেখে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা বলে তার হাত থেকে ভারী ব্যাগ দুটো আমি নিজের হাতে নিয়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে এরপর তাকে একটা রিকশায় উঠিয়ে দেই। সেই ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে আমি জানতে পারি যে তার দুই ছেলের দুজনই চাকরির সুবাদে ঢাকার বাইরে থাকায় তাকে একাই বাজারে আসতে হয়। এই কথা জানার পর চোখের সামনে তোমার মুখটা ভেসে উঠায় নিজেই নিজেকে অসংখ্যবার ধিক্কার দিয়েছি। এরপর সেদিন বাসায় ফিরেই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিন্ধান্ত নেই। পরে সিদ্ধান্ত মোতাবেক চাকরি ছেড়ে বাসায় ফিরে আসি। বাসায় ফেরার পথে ভেবেছিলাম চাকরি ছাড়ার কারণ হিসাবে সত্যি কথাই বলবো। কিন্তু সব শোনার পর তুমি যদি আমাকে বকাঝকা করো, তাই চাকরি ছাড়ার কারণ হিসাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে আমি একগাদা মিথ্যা কথা বলেছি, যাতে চাকরি ছাড়ার কারণটা তোমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ আমাদের বাসায় আশিকের আগমনের কারণে শত চেষ্টার পরও আমি শাক দিয়ে আর মাছ ঢেকে রাখতে পারলাম না। যাই হোক, মিথ্যে কথা বলার জন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। যদি পারো আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও।’
ইতি
তোমার আদরের বড় সন্তান
সাব্বির
সোনিয়া যখন সম্পূর্ণ চিঠিটা পড়া শেষ করে তখন আবেগে আমজাদ সাহেবের চোখে পানি চলে আসে। চোখের সামনে বাবাকে আবেগাপ্লুত হতে দেখে সোনিয়া বলল, ‘বাবা চল, ভাইয়াকে বাসস্ট্যান্ড থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি।’
‘এখন যদি বাসস্ট্যান্ডে যাই, তাহলে কি গাধাটার দেখা পাবো?’ একটু ভেবে আমজাদ জিগ্যেস করলেন।
‘আগে তো সেখানে যাই। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে যদি ভাইয়াকে না পাই, তাহলে না হয় তাকে ফোন করে ফিরে আসতে বইলো।’
“ঠিক আছে। চল তাহলে।”
‘দেখতো এতো সকালে তোমাকে কে ফোন করেছে।’ ঘুম ঘুম চোখে বেডরুম থেকে বেরিয়ে আমজাদ সাহেবের কাছে এগিয়ে এসে তার হাতে ফোন দিয়ে সালমা বলল।
‘যে নাম্বার থেকে ফোন এসেছে, সেই নাম্বার কি তুমি চেনো?’ ফোনটা হাতে নিয়ে আমজাদ জিগ্যেস করলো।
‘না, মনে হচ্ছে অপরিচিত কোন নাম্বার।’
ঠিক এমন সময় আবারও আমজাদ সাহেবের ফোন ভাইব্রেট মোডে বেজে ওঠে। তিনি ফোনকল রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে পুরুষকণ্ঠে একজন বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। আপনি কি আমজাদ সাহেব কথা বলছেন?’
‘জি, বলছি।’ সালামের জবাব দিয়ে আস্তে করে আমজাদ বললেন।
‘আমি ডাক্তার সোহেল। সদর হাসপাতাল থেকে আপনার সাথে কথা বলছি।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে? আর আমার নাম্বার কোথায় পেয়েছেন?।’ আমজাদের কণ্ঠে খানিকটা বিস্ময়ের সুর।
‘প্রায় আধা ঘন্টা আগে দুজন ব্যক্তি আনুমানিক বছর ত্রিশের একটি ছেলেকে গুরুতর আহত অবস্থায় সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। অবশ্য এখানে আসার আগেই ছেলেটি মারা গেছে। ছেলেটির প্যান্টের পকেটে থাকা মানিব্যাগের ভেতরে থেকে একটি কাগজ পেয়েছি, যেখানে আপনার নাম আর মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে।’ না থেমে এক নিঃশ্বাসে ডাক্তার সোহেল বলল।
‘কি বললেন! কাগজে আমার নাম আর মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে!’
আমজাদ যেন আকাশ থেকে পড়লেন। একটু থেমে পুনরায় তিনি বললেন, ‘আমার নাম আর নাম্বার ছাড়া ম্যানিবাগে চোখে পড়ার মতো আর কিছু পেয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুটো পাসপোর্ট সাইজের ছবি পেয়েছি। একটা ছবি হচ্ছে একজন বয়স্ক ব্যক্তির এবং অন্য ছবিটি বছর ত্রিশের এক ছেলের।’
‘ছবি দুটো আমার এই নাম্বারেই হোয়াটসঅ্যাপ করে দেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে আসতেছি।’ একটু ভেবে আমজাদ বললেন।
‘ফোনে কার সাথে এতক্ষণ কথা বললে?’ আমজাদ কথা বলা শেষ করতেই তার দিকে তাকিয়ে সালমা জিগ্যেস করলো।
‘সদর হাসপাতাল থেকে এক ডাক্তার ফোন করে বললো যে আধা ঘণ্টা আগে দুজন ব্যক্তি গুরুতর আহত অবস্থায় বছর ত্রিশের এক ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ছেলেটি মারা গেছে। কিন্তু সবচেয়ে আর্শ্চযের কথা হলো, সেই ছেলের ম্যানিবাগে থাকা একটি কাগজের টুকরোয় আমার নাম আর মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে।’ এক নিঃশ্বাসে এ পর্যন্ত বলে একটু থেমে মেয়ের দিকে তাকিয়ে পুনরায় তিনি বললেন, ‘তুই একবার তোর ভাইয়াকে ফোনে চেষ্টা করে দেখতো পাস কিনা।’
‘ঠিক আছে। আমি দেখছি।’
‘কি বলছো তুমি! এ আমাদের বুকের মানিক সাব্বির নয় তো।’ সালমার কণ্ঠে কিছুটা উদ্বিগ্নের সুর।
‘কি যা তা বলছো। এ আমাদের ছেলে হতে যাবে কেন?’ পরক্ষণেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে পুনরায় তিনি বললেন, ‘কিরে মা, তোর ভাইয়াকে ফোনে পেলি?’
‘না, বাবা। আমি তো পরপর কয়েকবার ফোন করলাম, কিন্তু প্রতিবারই নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি।’ কথাগুলো বলে সোনিয়া থামতেই কাঁদো কাঁদো গলায় সালমা বললেন, ‘এ আমাদেরই ছেলে, না হলে তার মানিব্যাগে কেন তোমার নাম আর মোবাইল নম্বর লেখা কাগজ পাওয়া যাবে….তার উপর এখন আবার ছেলেটার নাম্বার বন্ধ রয়েছে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে এখনই তুমি সদর হাসপাতালে যাও।’
‘মা, তুমি এভাবে কেঁদো না। একটু শান্ত হও। হয়তো কোন কারণে এখন ভাইয়ার ফোন বন্ধ রয়েছে। যদিও কাগজে বাবার নাম আর মোবাইল নম্বর রয়েছে…কিন্তু তারপরও কেন যেন আমার মন বলছে এটা আমার ভাইয়া না।’ দৃঢ়তার সাথে সোনিয়া বলল।
বাসা থেকে বেরিয়ে একটা রিকশায় চড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ আমজাদ সাহেবের ফোনে একটা মেসেজ আসে। পকেট থেকে ফোন বের করে একটি অপরিচিত হোয়াটসআ্যাপ নাম্বার থেকে আসা ছবি দুটো ভালো করে দেখে এরপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় আমজাদ বললেন, ‘মা, রে, এখন একবার তোর ভাইয়া ফোন করে দেখতো পাস কিনা।’
‘ঠিক আছে বাবা। দেখছি।’
ফোন করার পর তখনকার মতো এখনও বড় ভাইয়ের নম্বার বন্ধ পাওয়ায় তার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় সোনিয়া বলল, ‘বাবা, ভাইয়ার নাম্বার তো এখনও বন্ধ পাচ্ছি। কথাটা শুনে কিছু না বলে ফোনটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘এই ছবি দুটো ভালো করে দেখ।একটা আমার ছবি আর অন্যটা তোর ভাইয়ের।’
একটু থেমে উদাস গলায় পুনরায় তিনি বললেন, ‘যেভাবে সবকিছু একের পর এক মিলে যাচ্ছে, তাতে তো মনে হচ্ছে আমার আদরের বড় সন্তান আর এই দুনিয়াতে নেই।’ কথাটা বলার সময় চিরতরে সন্তানকে হারানোর বেদনায় বুকটা ভারী হয়ে যাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়।
বাবার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বড় ভাইয়ের ছবিটার দিকে তাকাতেই মুহূর্তেই আবেগে সোনিয়ার চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে। এতক্ষণ ধরে যে ধারণাটা সে একাই মনের মধ্যে পোষণ করে আসছিলো, বড় ভাইয়ের ছবিটা দেখার পর কেন যেন সেই ধারণা এক ফুৎকারেই তার মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বুঝতে পারে তার চোখের কার্নিশ অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে। বাবার সাথে আর কোন কথা না বলে চুপচাপ সে রিকশায় বসে থাকে।
ব্যস্ত রাস্তার একপাশ দিয়ে সাবধানে রিকশাা চালিয়ে সদর হাসপাতালের সামনে এসে রিকশাওয়ালা থামাতেই নেমে ভাড়া মিটিয়ে মেয়েকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালের অভ্যন্তরে গিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে ডাক্তার সোহেলের সাথে আমজাদ সাহেব কথা বলেন। কথা বলার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ডাক্তার সোহেল আসতেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
‘মারে আমি আর ভেতরে যাবো না। তুই ডাক্তারের সাথে গিয়ে ছেলেটার মৃতদেহ দেখে আয়।’
প্রায় মিনিট দশেক বাদে মৃতদেহ দেখে সোনিয়া যখন ফিরে আসে, তখন আমজাদ সাহেব রুমাল দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছছিলেন। তার কাছে এগিয়ে এসে খানিকটা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সে বলল, ‘বাবা, এটা ভাইয়ার মৃতদেহ না, অন্য কারোর।’
‘কি বলছিস তুই…এটা আমার সাব্বিরের মৃতদেহ না।’ মেয়ের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আমজাদ বললেন।
‘হ্যাঁ বাবা। আমি সত্যিই বলছি। এটা ভাইয়ার মৃতদেহ না।’
‘তোর মাকে জানিয়েছিস।’ আমজাদ জানতে চাইলেন।
‘হ্যাঁ, বাবা। এখানে আসতে আসতে মাকে ফোনে জানিয়েছি।’
‘তাহলে ওই ছেলের মানিব্যাগে আমার নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা কাগজই এলো কোথা থেকে আর ছবি দুটোই বা এলো কোথা থেকে।’ আমজাদ যেন হিসাব মেলাতে পারেন না।
‘সেটা তো আমিও ভাবতেছি। চলো আগে।’
হঠাৎ আমজাদের সাহেবের ফোনটা ভাইব্রেশন মোডে বেজে ওঠায় কথা বলার মাঝখানে সোনিয়া থেমে যায়। স্ত্রীর ফোনকল রিসিভ করে কথা বলা শেষ করে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আমজাদ বললেন, ‘আমাদের বাসায় যেতে হবে। তোর ভাইয়া ফিরে এসেছে।’

