বিশ্বাস বাড়ির পতিত ভিটার একধারে যে স্থানটিতে সাধারণত লোকের গমনাগমন চলেনা সেখানে সকলের নজর এড়িয়ে বাড়তে থাকে এক পেয়ারা গাছের চারা। নিতান্ত অযতনে বাড়তে থাকে চারাটা। তার মাথার উপর বৃহৎ বৃক্ষের ডালপালা ছাতার মতো ছাউনি দিয়ে আছে যা হতে শুকনো পাতার বৃষ্টি তাকে ঢেকে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। জল, সূর্যালোক ধরিত্রীতে অপ্রতুল হলেও তার জন্য বিন্দুমাত্র প্রদানেও প্রকৃতির কৃপণতার কমতি নেই।এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্বীয় মনোবল এবং আত্মবলের ফলস্বরূপ সকলের দৃষ্টির অগোচরে সে বেড়ে উঠতে লাগলো। তার এই নিঃসঙ্গতায় নিজেই নিজের সঙ্গী এবং এই একাকীত্ব তাকে এক অন্য রকম সুখ প্রদান করে।
কিন্তু যেহেতু স্রষ্টার সৃষ্টিতে কোন কিছুর বা কোন কারো জন্য সুখ নিরবছিন্ন নয়। তদ্রুপ তার এই একাকিত্বের সুখ আর অধিককাল স্থায়ী হলো না। তার শাখা প্রশাখায় শোভা বৃদ্ধি করে ফুলের সমারোহ দেখা দিল যা তার অজ্ঞাতবাসের যবনিকা পতন ঘটালো। এই ফুলই তার কাল হলো যেমন হরিণের মাংসই হরিণের চিরশত্রু।
একে একে বাড়ির প্রত্যেকে পেয়ারা গাছটির অবস্থান সম্পর্কে অবগত হলো। অনতিবিলম্বে গাছটি ফলবান হবে অর্থাৎ শুরু হলো দখলদারিত্ব। কোন ভাইয়ের পরিবার কোন অংশের ফল গ্রহণ করবে তা ফল ধারণ করার পূর্বেই নির্ধারিত হলো। একেক জন একেক বর্ণের কাপড় বেঁধে অধিকার নিশ্চিত করে গেল। ক্রমেই এই বিরানভূমি জনগণের অতিশয় গমনাগমনে ব্যস্ত স্থানে পরিণত হলো।
লোকের আনাগোনায় আধিক্য থাকলেও বৃক্ষটির ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না। সে ক্রমেই অনুধাবন করতে সক্ষম হলো যে, ভ্রমর মধুর লোভেই আসে বৃক্ষের প্রেমে নয়!
যাইহোক যথারীতি সে ফলবান হয়ে উঠলো। কিন্তু জন্মাবধি অযত্নে অবহেলায় এবং অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা গাছটি অধিক ফল ধারণ করতে পারল না। মনুষ্য সন্তান যেমন পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগে সুঠাম দেহের অধিকারী হতে পারেনা তদ্রূপ বৃক্ষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কেননা এত প্রমাণিত সত্য যে বৃক্ষেরও প্রাণ আছে। অধিক ফল ধারণ না করায় প্রত্যেকেই কিঞ্চিৎ অখুশি তথাপি ভাগের ব্যাপারে কেউ কোন রূপ ছাড় দিল না। অধিক না হলেও সুখের বিষয় এই যে তা বারোমাস ফল দিতে থাকলো। এই ফল অনেক পরিবারের অবলম্বন হয়ে উঠলো। কেউ তা বিক্রি করে সংসার চালায় কেউবা উদয়-পূর্তির মাধ্যমে ক্ষুধা নিবারণে প্রয়াসী হয় আবার কেউ কেউ তো শুধু শখের বসে ফল গ্রহণ করে থাকে।
কিন্তু কেউই একটি বারের জন্য গাছটির কিঞ্চিত পরিমাণও যত্ন নিল না। একে তো জন্মাবধি অনাদর তার ওপর এতদিনের ফল আহরণ জনিত অত্যাচারে ধীরে ধীরে তার জীবনের অন্তিম ক্ষণ এক প্রকার অনিবার্য হয়ে উঠলো। ফলশ্রুতিতে লোকজনের আসা-যাওয়া ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকল। ক্রমশ সে পূর্বের ন্যায় একা হয়ে পড়লো। একদিন তার জীবনাবসান ঘটলো কিন্তু তা সবার অজানাই রয়ে গেল। না কেউ ছিল সেখানে তার জন্য হা-হুতাশ করতে আর না কেউ দু’ফোটা চোখের জল ফেলল।
অনেকদিন পর বিশ্বাস বাড়িতে বড় ধরনের একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হল। সেখানে প্রচুর লোকের সমাগম হলো। ততদিনে তারা গাছটার কথা সবাই ভুলেই গেছে। এই আগত অতিথিদের জন্য বৃহদাকারে রান্নাবান্নার প্রয়োজন পড়লো আর তার জন্য প্রয়োজন হল অধিক শুকনো কাঠের। আর সেই শুকনো কাঠ খুঁজতে গিয়েই চোখে পড়লো সেই মৃত পেয়ারা গাছটা। শুকিয়ে গিয়েছে। এবং অন্বেষণকারী এটাকে উপযুক্ত জ্বালানি হিসাবে স্বীকৃতি দিল এবং তা নিয়ে এসে ফাল করে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হলো। সামান্যতম শোক অনুভব হলো না কারো। এক সময় যে ছিল অনেকের টিকে থাকার অবলম্বন তার মৃত্যুতেও কোন ব্যক্তি এতটুকু দুঃখও অনুভব করলো না।

