‘খোকা এখনো ঘুম থেকে উঠলি না, দেখ বেলা কয়টা বাজে। আজ না তুই কলেজে জয়েন্ট করবি?’
আড়মুড়িয়ে চোখ দুটো খুলতেই দেখি মা শিয়রে দাঁড়িয়ে তসবিহ হাতে নিয়ে কি যেনো পড়ছে, আমার মাথায় ফুঁ দিচ্ছেন। সামনের দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখি সকাল ৭.৫০ বাজে। একলাফে ওয়াশরুমে গিয়ে গোসলে ঢুকে মাকে চিৎকার করে বললাম, মা আমার নাস্তাটা তৈরি করে ফেলো। চাকরির প্রথম দিনেই লেট হয়ে গেলো মনে হচ্ছে। বের হয়েই কি পরব ভাবতে ভাবতে আলমারিতে থরে থরে ভাঁজ করা কাপড়গুলো উলটাতে লাগলাম।
ছোটবেলা থেকেই পাঞ্জাবির প্রতি আমার অন্য রকম ভালো লাগা ছিল। যেখানেই যেতাম পাঞ্জাবি পরেই যেতাম। দেখা যেতো কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়তে পাঞ্জবি পরে যেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করতাম। পর্যাপ্ত শার্ট থাকার পরও প্রয়োজন ছাড়া শার্ট পরাই হতো না। সুতরাং হরেক রং-বেরংয়ের পাঞ্জাবির ছিল আমার কাছে। তবে আজ সেটা পরা যাবে না। ফরমাল ড্রেস পরে অফিসে যেতে হবে। শার্টের থরগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ আলামারি এক কোনো নীল শার্টটি চোখে পড়ল। শার্টটা দেখেই বুকের ভিতরটা কেমন যেনো কম্পন অনুভব করলাম। শার্ট বের করে খুলতেই বুঝলাম এটা বাবার শার্ট। অযত্নে আলমারির এককোনে পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে।
চোখের সামনে বাবা যেনো ভেসে উঠলো। মনে হচ্ছিল বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বলছেন, এটা পরে আজ অফিসে যা। নীল শার্টটা বাবার মত্যুর বছর কোরবানির ঈদে গাওছিয়া মার্কেট থেকে কেনা। ঈদের একদিন আগে বাবা আমাকে নিয়ে বের হয়েছিলেন আমার, তার ও মায়ের ঈদের কেনাকাটা করবেন বলে। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক বাবা আমাদের পছন্দের কাপড় কিনে দিয়ে হাতে ছিল মাত্র পাঁচশত টাকা। যদিও পাঞ্জাবি কেনার ইচ্ছে ছিল এবার তার কিন্ত বাজেট স্বল্প হওয়াতে তিনি কমদামি একটা শার্ট খুঁজতে লাগলেন। এই দোকানে থেকে সেই দোকান।
অবশেষে একটি দোকানে এসে নীল রংয়ের এই শার্টটি তার পছন্দ হয়। কিন্তু দর কষাকষিতে বাজেটের বাহিরে হওয়াতে বাবা দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন। বাবার ঐ মুখখানি দেখে আমার ভীষণ মায়া হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ইস্! আমার কেনা শার্টটা ফেরত দিয়ে যদি বাবার জন্য এই নীল শার্টটা কিনে দিতে পারতাম তাহলে কতোই না ভালো হতো।
একটু সামনে গিয়ে বাবা আবার ফিরে যান দোকানটায়। বিক্রেতাকে আবারও অনুরোধ করেন কিছু মূল্য কমানোর জন্য। মা আর আমি বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছিলাম শার্টটা বাবার বেশ পছন্দ হয়েছে। আবার ফিরে আসায় বিক্রেতা এবার বাবার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আরো পঞ্চাশ টাকা কমিয়ে বলল, পাঁচশত পঞ্চাশ টাকার নিচে সে বেচতে পারবে না। এর থেকে কম বেচলে তার হাতে আর কিছুই থাকবে না। দম ধরে বাবা যেন কি চিন্তা করছিলেন, অমনি মা তার ভ্যানটি ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ঐটা কিনে ফেলতে।
বাবা খুশি মনে মার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে তার পছন্দের নীল শার্টটা কিনে ফেললেন। বাবা সেদিন শার্টটা কিনতে পেরেছিলেন দেখে আমার ও মার মনে একটা প্রশান্তি অনুভূত হচ্ছিলো। সমস্যাটা হলো বাসায় এসে। শার্টটা গায়ে দিতেই বাবা দেখলেন ওটা তার চাপা হচ্ছিল। যদিও আমার ও মার চোখে বাবার গায়ে শার্টটা মোটেও চাপা মনে হচ্ছিল না। কিন্তু বাবার ঢিলেঢালা পোশাক পরার অভ্যাস বলে এই সামান্য চাপাটাও তার বেশ চাপা মনে হচ্ছিল। এদিকে আমার আর বাবার উচ্ছতা প্রায় সমান হওয়ায় বাবা শার্টটা খুলে আমাকে দিয়ে বললেন, শার্টটা আমাকে পরে ফেলতে। কিন্তু স্বাস্থ্যের দিক থেকে আমি বাবার প্রায় অর্ধেক। খুব সহজেই বুঝতে পারছিলাম শার্টটা আমার ঢিলে হবে। আর ঢিলে শার্ট পরার অভ্যাস আমার মোটেও ছিল না। তাই পরব না বলে শার্টটা ধরেও দেখিনি। ঈদের দিন বাবা শার্টটা পরেছিলেন। তারপর বাবাকে আর কখনো সেটা পরতে দেখিনি।
বাবা মারা গিয়েছিলেন আমার এইচএসসি পরীক্ষার দুমাস আগে। তখন আমার টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। বাবা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন আমাদের কাঁদিয়ে পরপারে চলে গেলেন। বাবার মৃত্যুর পর মা আমার আলমারিতে বাবার নীল রংয়ের শার্টটা রেখে দিয়েছিলেন যেন মাঝে মধ্যে আমি তা পরি। কিন্তু এককোণে পড়ে থাকতে কখনো শার্টটা চোখে পড়েনি। লেখাপড়ায় খুবই খামখেয়ালি ছিলাম। পড়ালেখার প্রতি বাবার খুবই কড়াকড়ি থাকায় এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাই।
বাবা মারা যাওয়ার বছরে এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ পাওয়ার পরও পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে চান্স পাই। মায়ের অদম্য চেষ্টায় আজ লেখাপড়া পাঠ চুকিয়ে বাবার মতো শিক্ষক হয়ে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। মা বেশ খুশি, তার ছেলে বাবার মতো শিক্ষক হয়েছে। আজ সে প্রথম চাকরিতে যাচ্ছে। অথচ! এই বিশেষ দিনটি দেখার জন্য বাবা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে হয়তো আনন্দে তার চোখে পানি চলে আসতো। তা হওয়ার আগেই বাবা নিজেকে আড়াল করে নিলেন।
খুব যত্ন করে বাবার সেই নীল শার্টটি আলমারি থেকে বের করে আনলাম। তারপর সেটা গায়ে জড়িয়ে দাঁড়ালাম আয়নার সামনে। এখন আর ঢিলে মনে হচ্ছে না। তার মানে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে ছে। দ্রুত তৈরি হয়ে বের হয়ে এলাম রুম থেকে। এতদিন পর হঠাৎ আমার গায়ে বাবার নীল শার্টটি দেখে মায়ের চোখজোড়া ভিজে গেল। এমন বিশেষ বাবাকে পাশে না পাওয়ার আক্ষেপ তার চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল। নাস্তা সেরে মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের দিকে রওনা হলাম।
গাড়িতে বসতেই পাশের সিটে দশ বারো বছরের ছেলে ও বাবার দুষ্টুমি উপভোগ করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম যে, ছেলেটি কিছু একটা চাইছে আর বাবা সেটা দিবে না এমন ভান করে তার সাথে খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। আজ বাবা কথা বেশ মনে পড়ছে। বাবার প্রাইমারি স্কুলে আমার পড়ার সুযোগ হওয়াতে বাবার হাত ধরেই আমি স্কুলে যেতাম। সর্বক্ষণ তার সাথেই থাকতাম। এমন কত দুষ্টমি বাবার সাথে আমার ছিল, তা এক কথায় বলে শেষ করা যাবে না। চোখের পাতা দুটো বন্ধ করতেই একে একে সিনেমার পর্দার মতো ভেসে উঠছিল সেই সময়ের দিনগুলি। নিজের অজান্তেই চোখের কোন দুটো ভিজে গেলো। আজ অফিস ও কলেজের ছাত্রছাত্রীর আমাকে বেশ মানিয়ে নিল। সারাটাক্ষণ তাদের মাঝেই ডুবে ছিলাম। বিকেলে অফিস শেষে বাসায় যেতেই বাবার কবরটা জিয়ারত করলাম।
বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আজ আমার প্রথম চাকরির অভিজ্ঞাতাটা তার সাথে শেয়ার করলাম। বাবাকে বললাম, বাবা দেখ দেখ আমি তোমার নীল শার্টটা পরে আজ অফিস করলাম। মা থেকে শুরু করে অফিসের সবাই আমাকে এই শার্টের প্রশংসা করেছে। আমি গর্বের সাথে সবাইকে বলেছি, এটা আমার বাবার শার্ট। সবাই তোমার রুচিবোধের প্রশংসা করেছে। তাদের কথায় আমার যে কি রকম ভাল লেগেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। আজ তুমি নাই, আমার শরীরে তুমি জড়িয়ে আছ, নিশ্চই তুমি আমার এই বিশেষ দিনে শরীর জড়িয়ে ছিলে। আজ আমার জন্য এটা কম কিসের? বাসায় ফিরতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বোলাতে লাগলেন। কেনো যেনো মনে হচ্ছিল, মা যেনো আজ আমার মাঝে বাবার অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছিলেন।

