১৯১১ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময়ে নজরুল ‘লেটোদল’ ছেড়ে ‘মাথরুন নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউট’-এ ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানায় অজয় নদের তীরে মাথরুন নামক গ্রামে এ স্কুলটি অবস্থিত। এর প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদাবাদের কাশিম বাজার-এর মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী। তখন এ উচ্ছ ইংরেজি স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৮৩-১৯৭০)। এ স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন ষষ্ঠ শ্রেণিতেই দারিদ্র্যের কারণে নজরুলকে আপাতত প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় ক্ষ্যান্ত দিতে হয়। শুরু হয় নজ রুলের অনিশ্চিত ও শিশু-শ্রমিকের জীবন। তখন তার দুরন্ত কৈশোর। বয়স ১২/১৩। নয় বছর বয়সে পিতৃহীন হয়েছেন।
এ সময়ে পেটের দায়ে তিনি একটি কবি দলের (বাসুদেবের দল) জন্য পালা ও গান ইত্যাদি লিখে সুর দিতে শুরু করেন। কখনও কখনও ঢোলক বাজিয়ে আসরে নিজেও গান করতেন এ ‘বিস্ময়বালক’। রাণীগঞ্জে কোনো এক ‘ঝুমুর’-এর আসরে শিশুশিল্পী নজরুল একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের নজরে পড়েন। তিনি এখান থেকে নজরুলকে সরিয়ে নিয়ে এক অদ্ভুত চাকরি দেন। নতুন চাকুরিতে নজরুলের নিত্যদিনের কাজ হলো দেড়মাইল কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে গার্ড সাহেবকে স্টেশন থেকে তার বাংলোতে পৌঁছে দেয়া। আর তার জন্য বাংলো থেকে রান্না করা খাবার স্টেশনে পৌঁছে দেয়া। আরেকটা কাজ হলো শহর আসানসোল থেকে গার্ড সাহেবের জন্য বিলিতি মদ কিনে আনা। সেই সাথে উপরি হিসেবে সাহেব গার্ড ও তার স্ত্রীকে গান গেয়ে শুনানো। একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের এ অদ্ভুত কষ্টকর খানসামা-বাবুর্চির চাকুরির ইতি ঘটে কয়েকমাস পর।
এরপর মহকুমা শহর আসানসোলের একটি চা-রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ জুটান শিশু-শ্রমিক নজরুল। সেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও থাকার ব্যবস্থা ছিলো না। কিশোর নজরুল তখন রাত কাটাতেন দোকান সংলগ্ন একটি তিনতলা বাড়ির সিঁড়ির নিচে। ওই বাড়িটি ছিল পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ সাহেবের। তার দেশের বাড়ি ছিলো পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীরশিমলা গ্রামে। নজরুল কাজী সাহেবের দৃষ্টিতে পড়েন। সবকিছু জেনে মাসিক ৫ টাকা বেতনে তাকে গৃহকর্মীর কাজে নিযুক্ত করেন। কিন্তু নজরুল লেখাপড়া করতে চান। গৃহকর্তাকে অনুরোধ করেন তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিতে। মালিকের দয়া হয়। নজরুলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিতে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সাখাওয়াতউল্লাহকে পত্র লিখে ১৫ বছরের নজরুলকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন কাজী রফিজউল্লাহ।
মাথরুন স্কুল ছাড়ার দুই বছর পরে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল পুলিশ কাজী সাহেবের পাশের গ্রামের দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে তিনি কাজী সাহেবের বাড়ি ও অন্য আরো দ-ুএকটি বাড়িতে ‘জায়গির বা লজিং’ (ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়া) থেকে একবছর পড়ালেখা করেন। দরিরামপুর স্কুলে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন নজরুল এবং অজ্ঞাত কারণে দেশে ফিরে যান।
নজরুলের দরিরামপুর বাসের প্রায় ৮০ বছর পর আমরা এবার নজরুলের সন্ধানে ত্রিশাল-দরিরামপুরে যাবো কুমিল্লার নজরুল-গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক-এর সাথে। ওখানে এখন প্রতিবছর সরকারি উদ্যোগে ‘নজরুল-জয়ন্তী’ পালিত হয়। ত্রিশালে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। স্কুল-কলেজ সব সরকারি হয়েছে নজরুলের নামে। দরিরামপুর স্কুলে স্থায়ী ‘নজরুল মঞ্চ’ হয়েছে। হয়েছে ‘নজরুল একাডেমি’। এলাকাটা হয়েছে ‘নজরুলে নজরুলময়’। অথচ মাত্র এক বছর নজরুল এখানে জায়গির থেকে সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়া করেছিলেন।
এবার আমরা আমাদের লেখাটির শিরোনামের দিকে দৃষ্টি ফেরাবো। গত শতাব্দীর আশির দশকে নজরুল-গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক দেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮) কে সঙ্গে নিয়ে কাজীরশিমলা গ্রামে ‘দারোগা বাড়ি’তে যান। ওখানে তিনি একটি খাট দেখতে পান। যার একটি পায়ায় কাগজের মলাটে লেখা ছিলো, ‘এই খাটে নজরুল ইসলাম শয়ন করিতেন।’ পরবর্তীকালে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ‘নজরুল জয়ন্তী’র সরকারি অনুষ্ঠানে শ্রীভৌমিক আমন্ত্রিত হয়ে ত্রিশাল-এ যান। সঙ্গে ছিলেন ঢাকাস্থ ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’-এর তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক ড. মনিরুজ্জামান। তিনি আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাসাহিত্যের অধ্যাপকও। তারা জানতে পারেন, কাজী নজরুলের সরকারি অনুষ্ঠানে দারোগা কাজী রফিজউল্লাহর সন্তানদের যথাযথ মর্যাদায় দাওয়াত দেয়া হয় না। দাওয়াত দিতে তারা কাজী সাহেবের জ্যেষ্ঠপুত্রের বাসায় যান ময়মনসিংহ শহরের কাজীপাড়ায়। প্রথমে উষ্মাপ্রকাশ করলেও পরে তিনি অনুষ্ঠানে আসতে সম্মতি দেন। কথার একপর্যায়ে গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক কাজী বাড়িতে রক্ষিত নজরুলের সেই খাট সম্পর্কে জানতে চান। কাজীপুত্র জানান, এই খাটে নজরুলের শয়ন করার কোন প্রশ্নই উঠে না। এই খাটে তার বাবা ‘দারোগা সাহেব’ দেশে এলে শয়ন করতেন। অন্য সময় তার দাদা-দাদি শয়ন করতেন। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সে সময়ে যারা কোন সচ্ছল পরিবারে জায়গির থেকে পড়ালেখা করতেন তাদের ‘অন্দর মহল’-এ প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত ছিল। তারা ‘বাহির বাড়ি’তে ‘বাংলাঘর’-এ যেনতেন শয়ন করতেন। খাবার দাবারও ওখানেই যেতো। জায়গির-জীবন হলো ব্রাত্য-জীবন। নজরুল যে ঐ পরিবারে ভালো ছিলেন না তার প্রমাণ হলো তাকে একাধিক জায়াগর বদলাতে হয়েছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার পরও তার দেশে চলে আসার এটাও একটা কারণ হতে পারে।
অনুরূপ আরেকটি খাটের কথা জানাচ্ছেন নজরুল-গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক যেটি কুমিল্লার দৌলতপুর-এ আলী আকবর খাঁ সাহেবের বাড়িতে রক্ষিত আছে। এই সেই খাঁ সাহেব যার ভাগ্নি নার্গিস-এর সাথে নজরুলের ‘আকদ্’ হয়েছিল বলে বলা হয়। ওখানেও একটি খাটের গায়ে লেখা আছে, ‘এই খাটে নজরুল নার্গিসকে নিয়ে বাসর যাপন করেছেন।’ কিন্তু একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে সমর্থিত যে সে রাতে নজরুল-নার্গিসের বাসর-রাত যাপনের কোন বাস্তবতা ছিল না। ‘কাবিননামা’র শর্ত নিয়ে গোলযোগ বাধায় নজরুল কোন রকমে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সে রাতেই কুমিল্লা শহরের দিকে রওয়ানা দেন। সঙ্গে ছিলেন কুমিল্লার ইন্দ্রকুমার সেনগুপÍ- পরিবারের একটি ছেলে বীরেন সেনগুপ্ত। নজরুল ও খাঁ সাহেবের পূর্বপরিচিত সেনগুপ্ত পরিবার এ বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলেন। আষাঢ় মাসের অতিবৃষ্টিতে ১০/১১ মাইল জলকাদা মাড়িয়ে নজরুল বিয়ের রাতেই সারারাত হেঁটে পরদিন সকালে বীরেন-সকাশে কুমিল্লা শহরের ‘কান্দির পাড়’-এ হাজির হন।
তথ্য সহায়তা :
০১. ‘নজরুল জীবনী’, রফিকুল ইসলাম, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মে, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ।
০২. ‘কাজী নজরুল ইসলাম, জীবন ও সৃজন’, রফিকুল ইসলাম। নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ।
০৩. ‘শতবর্ষ আগে কুমিল্লায় নজরুল ইসলামের আগমন উপলক্ষে কিছু কথা’, শান্তিরঞ্জন ভৌমিক। ‘দৈনিক কুমিল্লার কাগজ’, ১৩ এপ্রিল ২০২১ সংখ্যা, কুমিল্লা।

