২০১৪ সালের কথা। জয়দেবপুর থেকে তুরাগে উঠেছি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে।
ট্রেনে বসে আছি, দৃষ্টি দূর আকাশে। কি দারুণ আকাশটা! মন উড়ে যেতে চাইছে আকাশ পানে। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি।সংসার, ছেলে-মেয়ে,স্বামী কারো কথা মনের আঙ্গিনায় নেই। এই মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সুখি মানবী। সুখটুকু বেশিক্ষণ টিকলো না। একটা নারী কণ্ঠের শব্দে চেতনা ফিরলো আমার। ‘শ্যার শ্যার আজকা কিছু দিতে পারুম না। আজকা অল্প কয়ডা জাম পাইছি। আরেক দিন দিমুনি।’
আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ওদের কথার ভাবভঙ্গিতে বুঝতে পারলাম মহিলা টিকিট কাটেনি। আর স্যার বলে যাকে ডাকছে, সে টিটি হবে হয়তো। আমি কিছু না ভেবে বলে ফেলি, কি এমন ক্ষতি হবে আমাদের বাংলাদেশের সরকারের আপনি তের টাকার টিকিট কাটেননি বলে? হয়তো আপনি গরিব টাকা নেই। কত মানুষ কত রকমের ফাঁকি দেয়। গ্যাস চুরি করে, ট্যাক্স দেয় না ঠিকমতো, জালিয়াতি করে, ব্যাংক জালিয়াতি। এত অনিয়মের পরে বাংলাদেশ সরকার বেঁচে আছে। আপনার এ-ই তের টাকার টিকিটের জন্য বাংলাদেশ সরকার মরবে না।
টিটি সাহেব এই কথা শোনার পর অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে নীরবে চলে গেল। ঠোঁট দুটো একবার কেঁপে ওঠেছিল। হয়তো মনে মনে আমাকে খুব বকাবকি করেছে। কিন্তু সেটা শব্দে প্রকাশ করেননি। টিটি সাহেব চলে যাবার পর জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ব্যাপার বলুন তো!’
মহিলার উত্তর, ‘আরে আফা টিকেট কাডি নাই। মাজে মাজে এইডা ওইডা দিয়া মাগনা ডাহা যাইগা। গ্রামের বিতরতে কমদামে কিন্না ডাহায় নিয়া বেচি। কয়ডা টাহা অয় আফা। গরিব মানুষের কপাল।’
আমার প্রশ্ন ছিল, ‘কি কি বেচাকেনা করেন?’
‘এই দরেন যহন যা পাই তাই। মুরিগ, হাঁস, জাম, আম, পেয়ারা।’
‘ও আছা। প্রতিদিন আসেন?’
‘হ।’
‘প্রতিদিন কি টিটি সাহেবকে এটা সেটা দিতে হয়?’
‘না। যেদিন বেশি আনি সেদিন দেই। এই রবিবার দুই কেজি জাম দিছিলাম।’
‘টিকিটের দাম জানেন?’
‘না আফা।’
‘তের টাকা। আপনার দুই কেজি জামের দাম কত?’
‘একশ বিশ টেকা।’
‘আপনার লাভের গুড় পিঁপড়া খায়। এরপর থেকে টিকিট কাটবেন। টিটিকে কিছু দিবেন না। আপনি সিটেও বসেন না। নিচে বসে আছেন।’
‘হ আফা ঠিক কইছেন। গরিব মানুষ লেখাপড়া নাই। বুঝি কম।’
‘শোনেন, আপনিতো কমলাপুর নামবেন?’
‘হ আফা।’
‘তাহলে ভাড়া আরো কম হবে।’
‘আজ কি এনেছেন দেখি! কাপড় সরিয়ে বড় বড় গোলাপ জামগুলো বের করে আমাকে দেখালো। আমি তো দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। জিবে জল এসে গেল।’
‘আমাকে আধা কেজি দেওয়া যাবে?’
‘কি কন আফা! যাইবো। আনতাজে দেই। বেশি হইবো, কম হইবো না। পাল্লাডা অনেক নিচে।’
‘ঠিক আছে দিন।’
আমি টাকা দিয়ে জাম মুখে পুরলাম। কি রসালো। খেতেও সুস্বাদু, দারুণ। মহিলার দিকে তাকিয়ে জাম খাচ্ছি।
‘খাবেন আপনি?’
মহিলা মিষ্টি করে হাসি দিয়ে বললো, ‘কি কন আফা! খান আপনে।’
‘আমাদের দেশি ফল। যার তুলনা হয় না দামও খুব কম। আপেল আঙুরের চেয়ে শতগুণে ভালো।’
‘আফা কই যাইবেন?’
‘নারায়ণগঞ্জ।’
‘হেইডা কি আমার আগে না পরে? আপনের পোলাপান নাই একলা যে!’
‘আছে। এক ছেলে, এক মেয়ে।’
‘এহানে কেরে আইছেন? গাজীপুর আমার বাড়ি আছে। কিছু কাজ ছিল, করাতে এসেছি। আপনার বাচ্ছা কয়জন?’
‘দুইডা পোলা আফা।’
‘স্বামী কই থাকে?’
বড় বড় চোখ, পাতলা ঠোঁট, চিকন নাক। এক সময় খুব সুন্দর ছিলেন বোঝাই যাছে। দুঃখে কষ্টে আজ বিবর্ণ। রেলগাড়ি চলছে আপনগতিতে। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে। কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল সেই কথাটা, কি যেন খায়!
কি খায়? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি। নিশ্চয়ই নেশাজাতীয় কিছু হবে।
ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন? না এসব নয়। এসবের দাম বেশি, সহজলভ্যও নয়। মনে হয় গাঁজা হবে। খায় আর ঘুমায়। হুম গাঁজাই হবে। হায়রে নেশা! কি যে হবে! দেশটা শেষ করে দিছে, যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে!
সেদিনের কথা আমাদের পাশের বাড়ির একটা ছেলে। কি সুন্দর দেখতে। বাবার টাকা পয়সার অভাব নেই। নেশায় আসক্ত। ডিবি পুলিশ ইয়াবাসহ ধরে নিয়ে গেছে। অনেক টাকা খরচ করে ছাড়িয়ে এনেছে। ভিষণ মেরেছিল। টাকা, মানসম্মান সবই গেল। ওর মা স্ট্রোক করেছে ছেলের টেনশনে।
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসে বুকের গহীন থেকে। আমার ছেলের হাসি ভরা মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। আমার ছেলেটা ভালো আছে তো? নাকি অসৎ সঙ্গে মিশে নষ্ট হয়ে যাছে! ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন ছুটে চলে তার আপন গন্তব্যের দিকে। আর আমার মনের গহিনে কষ্টের ঘণ্টা বেজে চলেছে ট্রেনের শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে বুকের ভেতরে। নিজের অজান্তে চোখ থেকে গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে নিচে পড়ল।
হে আল্লাহ তুমি আমার ছেলেটাকে ভালো রেখো। বুকের গহিন থেকে আরেটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
‘আফা! ও আফা! আইয়া পরছি কমলাপুর। নামবেন না?’
মহিলার কথায় আমার চেতনা ফিরে এলো। বললাম, ‘আমি নারায়ণগঞ্জ যাবো। আপনি তো এখানে নামবেন।’
‘হ আফা। আফনের কতা আমার মনে থাকবো। বুলমু না। অনেক বালা মানুষ আপনে।’
ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। মহিলাটি তার জিনিসপত্র নিয়ে নেমে কোমর দোলাতে দোলাতে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল, আমি তাকিয়ে রইলাম তার অদৃশ্য পথপানে। মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো, হে আল্লাহ তুমি এই নারীকে ভালো রেখো। সে যেন জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হয়। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম ট্রেন ছেড়ে দিল আপন গন্তব্যের দিকে।

