যুক্তিবিদ্যার জনক এরিস্টটলের একটা উক্তি- জেগে স্বপ্ন দেখাই হছে আশা।
আমার কাছে এই জেগে স্বপ্ন দেখা বেশ দারুণ লাগে। কারণ এতে ব্যক্তি তার নিজের স্বপ্নকে নিজের মতো করে সাজাতে পারে। চলুন একটু অন্য ভাবে বুঝতে চেষ্টা করি! কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেই, আমি যাকে আমার আপন করতে চাই সে সমাজবাস্তবতায় আমার থেকে অতি উচ মর্যাদার যাকে চোখ বুজে সম্মান করা যায়। সে আমার সীমানারেখার বাইরে। কিন্তু আমি চাইলে অতি সহজ পন্থা অবলম্বন করে তার সাথে চলাফেরা করতে পারি, একসাথে সুন্দর পৃথিবী ভ্রমণ করতে পারি, অধিকাংশ সময় তার সাথে কথা বলতে পারি। মোটকথা তাকে আমি নিজের মত করে ব্যবহার করতে পারি। আমি যেমন চাই ঠিক তেমন ভাবে। বলে রাখা ভালো, আমার সেই সহজ পন্থায় তাকেও তার ইছার প্রকাশ করতে দিব। মূলত সেই সহজ পন্থা হলো স্বপ্ন। এভাবে কিন্তু কোন বৃহৎ সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। আমার কাছে মনে হয় একটি সমস্যার কমপক্ষে পনেরোটি সমাধান থাকে। কোন মানুষের সফলতার কথা শুনলে দেখা যায় সেই লক্ষ্য অর্জন তার স্বপ্নে ছিলো। তিনি স্বপ্নে সেটা পূরণ হতে দেখেছেন পরে সেটা বাস্তব হয়েছে।
তানভীর মোকাম্মেল তার ‘চলচিত্র নন্দনতত্ত্ব ও বারোজন ডিরেক্টর’ গ্রন্থে লিখেছেন, …জঁ মরিস ইউজিন ক্ল্যেমেন্ত ককতো (৫ জুলাই ১৮৮৯ – ১১ অক্টোবর ১৯৬৩) বলতেন, ‘যখন আমি ঘুমিয়ে থাকি এবং স্বপ্ন দেখি একমাত্র তখনই আমি যথার্থ বেঁচে থাকি’-বোঝা যায় ওঁর কাছে…সাধারণ বাস্তবতার চেয়েও স্বপ্ন ও অবাস্তবতার জগতটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
এখানে মরিস ককতোর উক্তিতে ঘুমের কথা আছে আর এরিস্টটলের উক্তিতে জেগে থাকার কথা। অনেক সাংঘর্ষিক হয়ে গেল তাই না? তবে এই সাংঘর্ষিক দিকে আলোকপাত না করে গুণী নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের কথা উল্লেখ করি। তিনি মরিস ককতো’র কথার গুরুত্বে পেয়েছেন স্বপ্ন ও অবাস্তবতার জগতকে। স্বপ্ন জেগে দেখা হোক বা ঘুমিয়ে দেখা হোক স্বপ্ন অবাস্তব। এই অবাস্তবকে পরাবাস্তব বা স্যুরেয়ালিজম বলা যাবে কিনা এ সম্পর্কে আমার তুছ জ্ঞানে কোন রায় দিব না। তবে জ্ঞানীদের নিকট প্রশ্নটি তুলে ধরব। অবশ্য ফরাসি লেখক অঁদ্রে রোবের ব্র্যতোঁ (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৬ ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬) পরাবাস্তববাদকে ‘খাঁটি মানসিক স্বয়ংক্রিয়তা’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
১৯২০ সালের দিকে ফ্রান্সের প্যারিস থেকে পরাবাস্তব বা স্যুরেয়ালিজমের সূচনা হয়। এই মতবাদের মূলকথা অবচেতনমনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্যকর সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা। এখানে প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে। যে সকল উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে পরাবাস্তব বা স্যুরেয়ালিজম প্রকাশ হয়ে থাকে- আর্ট, সাহিত্য, চলচিত্র এবং সংগীত এ। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য ১৯৫৪ সালে ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে লোকসংগীত বিষয়বস্তু ও বিস্তারের ওপর ভিত্তি করে ৫ ভাগে ভাগ করছেন- আঞ্চলিক, ব্যবহারিক, আনুষ্ঠানিক, কর্মসংগীত ও প্রেমসংগীত। প্রেমসংগীতের মাধ্যমে নর-নারী পরস্পরের প্রতি সংগীতের মাধ্যমে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। এই অভিব্যক্তি প্রকাশ হয় পরাবাস্তব বা স্যুরেয়ালিজম ভাবে।
পরিশেষে দেখা যায় যে, স্বপ্ন মানুষকে নতুনভাবে ভাবাতে সাহায্য করে। অনেকসময় দেখা যায় অবচেতন মনে স্বপ্ন দেখলে তাতে বাস্তবতার কোন না কোন প্রভাব থাকে। আবার ঘটে যাওয়া ঘটনাকে অনেক সময় মনে হয় পূর্বেই স্বপ্নের মাধ্যমে দেখেছিলাম এটা ঘটবে। এভাবেই স্বপ্নের ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় আশা। আশা থেকে প্রবল আশা। তারপর সেটা বাস্তব রূপে আবির্ভূত হয়। সেজন্যই মনে হয় এরিস্টটল বলেছিলেন, ‘জেগে স্বপ্ন দেখাই আশা।’

