গভীর প্রজ্ঞা না থাকলে কবি হওয়া যায় না। উত্তম কবিতা লেখাও যায় না। একজন কবি, যিনি আধুনিক কিংবা উত্তরাধুনিক যে-ই ফর্মেই কবিতা লিখুন না কেন, সেটি সমৃদ্ধ শিল্পের উদাহরণ তখনই সৃষ্টি করবে, যখন তার গভীর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও মননশীলতা কর্ম আকারে প্রকাশিত হবে। মহান কবিদের কবিতা পাঠ এবং তাদের সম্পর্কে এনালাইসিস করলে এমন উপলব্ধি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণ হিসাবে সামনে আনতে পারি নজরুলের বিদ্রোহী, জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিন, বনলতা সেন, রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী প্রমুখ। গত একশ কিংবা দুশো বছরের বাংলা সাহিত্যের কাণ্ডারিদের সৃষ্টি থেকে আমরা কী পেলাম তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দ্বিতীয় দশকের কবিদের লেখা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে মনে আসে, এদের নিজের সেরা কবিতা লেখার সময়, অভিজ্ঞতা এবং সৌভাগ্য আদৌও কি হয়েছে?
প্রশ্নটি বাস্তবসম্মত। এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কেননা লিখতে আসার পরপর নানান অলিগলি পেরিয়ে যখন কিনা কবিতা সৃষ্টির রাস্তা চিনে উঠেছে, তখনই আরেকটি দশক এসে হাজির! ফলে দ্বিতীয় দশকে আমরা রজত সিকস্তি, মহিম সন্নাসী, বিধান সাহা, হিজল জোবায়ের, জিয়াবুল ইবন, নুসরাত নুসিন, জিনাত জাহান খান, অরবিন্দ চক্রবর্তী কিংবা শঙ্খচূড় ইমামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতার দেখা পাইনি। তাদের মতো উল্লেখযোগ্য কবিরা বেশ ভালো ও উল্লেখযোগ্য কবিতা উপহার দিলেও কবিতার নানাবিধ মাত্রায় শিল্পসমৃদ্ধ ক্লাসিক কবিতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমরা। অপেক্ষায় আছি তাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা উপহার পাবার। হয়তো এদের মধ্যে কেউ অথবা এমন কেউ শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখবে যাকে আমরা আলোচনার মধ্যে আনিনি কোনদিন। অস্বাভাবিক নয়। জীবন যেমন মিরাকল, শিল্পসাহিত্যও তাই!
সংকট কী তাহলে? কেবলই কি সময়ের আগে প্রত্যাশা নাকি ঘটনার পেছনে রয়েছে অসংখ্য অলিগলি ও ফাঁদ! একটু আলোচনা করা যাক। প্রথমে বলে রাখা ভালো, এই লেখাটি আমার ব্যাপক ভাবনাচিন্তার সামান্য প্রকাশমাত্র। কোন একদিন দ্বিতীয় দশকের কবিতা নিয়ে বিস্তারিত লিখবো। আজ কেবল এর ইন্ট্রো –
বাংলা শিল্পসাহিত্য চর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম লিটলম্যাগ হোঁচট খেয়ে যাবার জন্য এক ফেসবুকই যথেষ্ট! দৈনিক পত্রিকা যা পারেনি, সাহিত্যের নানান ছোট-বড় কাগজ যা পারেনি, আমেরিকার আবিষ্কার তা পারল। শুধু যে আমাদের লিটারেচারের মাথা (লিটলম্যাগ) খেয়ে ফেলেছে তা নয়, এই ফেসবুক আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, চারা থেকে বটগাছ খেয়েদেয়ে বসে আছে। শুধু যে লিটলম্যাগের চর্চা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নয়। ফেসবুকে কাব্যচর্চার ধারণা থেকে প্রাপ্ত কনসেপ্ট নিয়ে সাহিত্যের ওয়েব পোর্টাল, ব্লগজিন, অনলাইন পেইজ, অনলাইন গ্রুপ কী হয়নি? সবই গোল্লায় নিয়ে গেছে। অনেকে বলবেন কীভাবে গোল্লায় নিল? এ থেকে আধুনিক যুগের সাথে আমরা আরও একধাপ এগিয়েছি! যদি তাই হতো, গত ১৫ বছরে নবীন-প্রবীণ কবি, কথাসাহিত্যিকরা কয়টা মাস্টারপিস উপহার দিয়েছে? একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা কি লেখা হয়েছে এরমধ্যে? একটা ইউনিক মাস্টারপিস উপন্যাস কি পেয়েছি আমরা যা আমাদের মন জয় করে বিশ্বজয় করতে পেরেছে? আন্তর্জাতিক মানের কবিতা লেখা হয়েছে স্বীকার করছি। সেগুলোর মূল্যায়ন তো দূরে থাক, প্রকাশ করা হয়েছে বলে শুনিনি একমাত্র পলিয়ার ওয়াহিদের কাব্যগ্রন্থ ব্যতীত। সেটি ভারতের প্রকাশনা ছিল যদিও। আন্তর্জাতিক বলতে আমি বহির্বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যাওয়ার কথা বলছি। ভারতের সীমানায় না চাইলেও পৌঁছানো সম্ভব। সাহিত্য নিয়ে ওদের মাস্তানি (দাদাগিরি) আর আমাদের চুলকানি (খ্যাতির আকাক্সক্ষা) রীতিমতো দুপক্ষকে বোকার স্বর্গে রেখেছে। যাই হোক, যে যার মতো ভাবুক, কাজ করুক, এই ফাঁকে দ্বিতীয় দশকের কবিদের স্ট্রাগল নিয়ে আলোকপাত করা যাক।
শুরুতেই বলবো পাসওয়ার্ড নামক এক অদ্ভুত কবিতার যাত্রা নিয়ে। কবি মহিম সন্ন্যাসীর লেখা এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের সিন্ডিকেট লিটল ম্যাগাজিন লোক এ প্রকাশিত হবার পর রীতিমতো হইচই শুরু হয়ে যায়। অনেকেই এই কবিতার কন্ট্রা কবিতা লিখেছে। যা নতুন কিছু লিখবার খোরাক জুুগিয়েছে অনেকের। এরপর চমক দেখিয়েছেন কবি বিধান সাহা। তার প্রকাশিত কবিতার সবগুলোই পাঠযোগ্য এবং আনন্দদায়ক অভিযাত্রা। একইভাবে জিনাত জাহান খান দারুণ কিছু কবিতা নিয়ে হাজির হলেন। ভালো লিখে আলোচনায় এলেন হিজল জোবায়ের, অরবিন্দ চক্রবর্তী, রজত সিকস্তিসহ হাতেগোনা কয়েকজন। সানাউল্লাহ সাগর, যে আমার বেশ ভালো একজন বন্ধু, তার কবিতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। অসীম সম্ভাবনা নিয়ে আসা যে কজনের কবিতা আমাকে দিনদিন হতাশ করেছে, সানাউল্লাহ সাগর তাদের দলে রয়ে গেছেন। ভালো লিখবার মতো শক্তি ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভালো ও পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্ত্র হয়ে উঠেনি বা ভালো কবিতা লিখতে পারেনি তেমন তালিকায় আরও আছেন অমিত আশরাফ, শিমন রায়হান, ইলিয়াস কমল, খাদিজা ইভ, মন্দিরা এষ, অনিন্দ্য দ্বীপ, শ্রাবণ সৌরভ, সাম্য রাইয়ান প্রমুখ।
উপরোল্লিখিত কবিরা আমার কাছে অসীম সম্ভাবনাময় বলে তাদের নাম উচ্চারণ করলাম। এরকম কয়েক ডজন নাম আমি নিতে পারবো। তাতে কার কী যায় আসে? যাই হোক, স্ট্রাগলের কথা বলতে চেয়েছিলাম। সেটা চলছেই। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন লেখালেখির বয়স পেরিয়ে দ্বিতীয় দশকের কেউ সংসারী, কেউ স্বেচ্ছায় আড়ালে বাস করছে, কেউ ভয়াবহ নেশাগ্রস্ত, কেউ ঢাকা ফেলে চাকরির জন্য গ্রামবাসী, কেউ পরের বউ নিয়ে মত্ত, সবশেষে কবি হিসাবে এরা প্রত্যেকেই লিখে যাচ্ছে কাগজে, কম্পিউটারে, মোবাইলে, নিজের মস্তিষ্কে, হৃদয়ে কিংবা প্রিয় মানুষটির মেসেঞ্জারে। সে চলুক! আসল স্ট্রাগল হিসাবে, মূল সংকট হিসাবে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রকৃত গণতন্ত্র বনাম আমরা আর মামুরা তন্ত্র! দেশে কথা বলার স্বাধীনতা নাই। মুক্তচিন্তা এখন চাপাতির নিচে। লিখে কেউ জেলে যেতে চায় না। তাই তেমন কিছু সচেতনভাবে লিখেও না। লিখলে প্রকাশও করে না। যারা লিখতে চায়, তাদের দমানোর জন্য সিনিয়র লেখক, কবিরাই যথেষ্ট। এদেশে গার্ডিয়ান পাওয়া যায় ফ্রিতে। সাহিত্যে গার্ডিয়ান পেতে অবশ্য কোন না কোন মারফত লাগে। গ্রুপ স্টাডি লাগে। মানে এমন স্টাডি যা যুগের পর যুগ চললেও সাহিত্যে একটা মাস্টারপিস কীভাবে লিখিত হয়ে উঠে তা এরা জানে না। শেখাবে কী?
আধুনিক সময়ে উত্তরাধুনিক কবিতা লিখবার এই মহাযজ্ঞে আপনিও সেরাদের সেরা হতে পারেন হে আগন্তুক। যেভাবে অসাধারণ কবিতা লিখে শূন্য দশকে সেরাদের সেরা হতে পেরেছিলেন কবি জুয়েল মোস্তাফিজ। নব্বই দশকে কবি মুজিব মেহদী। এই সময়ে আপনি কেন নন? এগিয়ে যান। দেশ ও বহির্বিশ্বের সব ভাষার কবিতা পাঠ করুন। দেখুন তারা কীভাবে ভাবছে আর আমরা কীভাবে ভাবছি! পার্থক্য কিন্তু বিস্তর!

