সন্ধ্যাবেলা। মাগরিব ছুঁই ছুঁই। মাঝারি সাইজের একটা মাটির রাস্তা। রাস্তা দিয়ে আড়াআড়ি একটা বড় সাইকেল রাখলেই রাস্তাটি বন্ধ। দুইপাশ দিয়ে কেউ এক পা দিয়েও দাঁড়াতে পারবে না। রাস্তার দুপাশে লতা-গুল্ম ও সবুজ ঘাসের ঝোপঝাড়। হালকা পাতলা জঙ্গল বলা যেতে পারে। রাস্তার পাশেই জঙ্গলের ভিতরে গাছের উপর তিনখানা তক্তা দিয়ে পাঁচ ফিট পরিমাণ লম্বা একটি টুল পাতা।
টুলের একটু পেছনেই দশ কি এগারোটা বাঁশগাছ নিয়ে একটা বাঁশঝাড়। বাঁশ ঝাড় ছেড়ে কয়েক পা এগিয়ে ঘন জঙ্গল। এ জঙ্গল হলো আগাছার জঙ্গল। এখানে কেউ থাকে না। যে থাকে সে হলো আমি। মূলত এই জমির মালিকের কোন ওয়ারিশ নেই। তিন চারজন মেয়ে কিন্তু ছেলে নেই, তাই তাকে বেওয়ারিশ বলা হয়। মেয়েদের বিবাহ হয়ে গেছে। তারা শ্বশুরবাড়ি দিব্যি ভালো দিন কাটাছে। তাদের বাবা-মা মারা গেছে। তাই এখন এই জমি শুধু জঙ্গলের আর আমার। জঙ্গলে বেশকিছু ফলের গাছ আছে। যেমন কাঁঠাল গাছ আছে মোটামুটি চার থেকে পাঁচটা। তাও আবার ফলদার। প্রত্যেকবার ফল দেয়ার সময় হলেই ফল দেয়। জামরুল, জাম্বুরা, চালতা, সুপারি, নারিকেল, সফেদা, পেয়ারা, আম, পায়লা ইত্যাদি। যে গাছের নাম মনে থাকে সেগুলো ফটাফট এসে গেছে, আর যেগুলো মনে নেই সেগুলো নাম না জানা ফল গাছ ধরে নিলেই হবে। কিন্তু যেগুলোর নাম বলেছি সেগুলো কিন্তু সত্যিই আছে। তোমার যদি কিছু ভালো না লাগে তাহলে তুমি এই বাগানে নামবে আর জ্বালানি কুড়োবে, আর ওপরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ফল গাছ দেখবে আর গুনবে। দেখবে মন খারাপ কোথায় যেন চলে গেছে। এটা আমার এক্সপেরিয়েন্স।
চলো, বাগানের বর্ণনা তো হয়ে গেল। এখন আসি ঘটনায়, একদিন বিকেলে ঘরে কোন কাজ নেই। কি করবো ভেবে পাছিনা। সুন্দর করে অজু করলাম। হিজাবটা পরে মুখোশটা পড়তেই কি যেন মনে হলো! দরজার সামনে গিয়ে দেখি, কেউ নেই। শুধু খাঁ খাঁ রোদ ছড়িয়ে আছে। আজান পড়েছে আসরের। নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। নামাজ শেষে সবসময় শুয়ে থাকি না হয় কিছু খাই। কিন্তু আজ খিদে নেই।
ক্ষণকাল পর কি যেন মনে করে ঘর থেকে নেমে বাগানের কাছে পাতা টুলটাতে গিয়ে বসলাম। যখন বসেছি তখন কেউ ছিল না। কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করি একজন মধ্যবয়স্ক মেয়ে আমার পাশে টুলে বসা। প্রথমে চমকে উঠি কিন্তু পরক্ষণই স্বাভাবিক হয়ে যাই।
‘আসসালামু আলাইকুম! কে আপনি? কোথা থেকে এসেছেন?’
‘আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। ক্লান্ত হয়ে গেছি। তাই এখানে বসলাম।’
‘আছা ভালোই হয়েছে। কথা বলার কাউকে পাওয়া গেছে। পানি খাবেন?’
‘নাহ কিছু খাব না!’
‘কতদূর যাবেন?’
কোন কথা নেই।
অনেকক্ষণ বসে থেকে মুখ গোমড়া করে চলে গেল। আমি তো চেয়েই রইলাম। কিছুদূর যেতেই উধাও। বুঝতে পারলাম না কোন দিকে গেল!
পরের দিন ভোরে দরজা খুলতেই বসার টুলের উপরে নজর পড়ল। ওমা! দেখি সেই ওড়না, সেই জামা, সেই মেয়ে! প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে নিজেই কাছে গেলাম।
‘আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন আপনি? কালকে জিজ্ঞেস করতে মনে নেই, আপনি কোথায় থাকেন! আজকেও কি অনেক ক্লান্ত? চলেন! ঘরে চলেন! আমি আপাতত এই বাড়িতে থাকি। চলেন, এত সকালে যখন আসছেন নাস্তা করে যাবেন, আসুন।’
‘আমি এইখানেই থাকি। কাছেই। আমার কথা বলার কেউ নেই। আমি কথা বলতে এসেছি। আমার কথা কেউ শোনেই না।’
‘ জি বলেন, আমিও সারাদিন একা একা থাকি। চলেন ঘরে বসে কথা বলি। না হয় কথার ছলে পড়লে নাস্তা বানানো হবে না, রান্না হবে না। আমার ঘরের লোক রাগ করবে। আসেন ঘরে বসে কথা বলি।’
‘না আমি এখানেই ঠিক আছি। আপনি আমার সাথে বসে কথা বলেন। ঘরের কাজের কোনো ক্ষতি হবে না। আমার পাশে বসেন। শুধু আপনি আমার সাথে কথা বললেন, আর কেউ আমাকে দেখেই না। দেখেও না দেখার ভান করে। বলতে বলতে কেঁদেই দিল!’
আমি ইতস্তত হয়ে বললাম,‘আপনি কাঁদবেন না! বলেন, আপনি কি বলবেন! আগে বলেন আপনার নাম কি? আপনি কোন ধর্মাবলম্বী?’
‘আগে আমার কথা শুনেন। পরে নিজেই বুঝতে পারবেন আমি কোন ধর্মের!’
‘আছা বলেন কি বলবেন!’
‘আপনার কাছে আমার সব প্রশ্নের জবাব আছে?’
একটু হেসে বললাম, ‘প্রশ্নের সৃষ্টি তো উত্তরের জন্যই। আমার কাছে যতটুকু আছে তার ভেতরে আপনি যদি প্রশ্ন করেন তাহলে তো আমি উত্তর দিয়ে দিব।’
‘আর যদি না দিতে পারেন।’
‘আমি না পারলে অন্য কারো কাছে তার উত্তর হবে। আপনি প্রশ্ন তো করেন!’
‘বলেন তো প্রশ্ন করা সহজ নাকি উত্তর দেওয়া?’
‘আমার মতে প্রশ্ন করা কঠিন। প্রশ্ন যদি একবার হয়েই যায় উত্তর এসেই যাবে। আল্লাহ প্রশ্ন যখন দিয়েছেন, উত্তর তো দিয়েই রেখেছেন।’
‘বলেন তো মানুষ জন্ম নেয় কেন?’
‘মানুষ জন্ম নেয় না। বরং মানুষ হিসেবে জন্ম দিয়ে পাঠানো হয়। কেবলমাত্র আল্লাহর এবাদত করার জন্য।’
‘মানুষ বানাতেই বা বলেছে কে।’
‘আল্লাহর কারোর অনুমতি প্রয়োজন হয় না। কারো বলার অপেক্ষা রাখেন না তিনি। কারণ তিনি নিরাকার।’
‘আপনি তাকে দেখেছেন?’
‘আফসোস! আমার এখনো তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। ইনশাআল্লাহ জান্নাতে মালিকের দিদার লাভে ধন্য হব।’
‘কেউ কি তাকে দেখেছে?’
‘অবশ্যই, আল্লাহর নবী, রাসূলগণ তাকে দেখেছেন।’
‘তিনি দেখতে কেমন?’
‘আমার জানা নেই।’
‘আছা আপনি একই কাজ করতে করতে বিরক্ত হন না?’
‘অবশ্যই হই, কেন?’
‘তাহলে কেন করেন? আর কিভাবে করেন? মরে যেতে ইছা করে না?’
‘আস্তাগফিরুল্লাহ! কি বলেন! আমি কি একা একাই দুনিয়াতে আসতে পেরেছি? আমাকে একটা নিজস্ব সময় নির্ধারণ করে পাঠানো হয়েছে। আমার মরে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। আমাকে এত সুন্দর একটা পৃথিবী দেওয়া হয়েছে, কত মায়া ছড়িয়ে আছে চারদিকে। আমার জন্য মৃত্যু অনিবার্য। সময়মতো আমাকে নিয়েই যাওয়া হবে। খামোখা আমি সময়ের আগে কেন চলে যাব? আমাকে আল্লাহ দুনিয়াতে পাঠিয়ে যা দিয়েছেন তার শুকরিয়া আদায় করতে করতে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আগেই হয়তো আমার দুনিয়াতে থাকার সময় শেষ হয়ে যাবে। তখন আমার নাও যেতে ইছে করতে পারে। কিন্তু যেতে হবে। তবে কেন শুধু শুধু আল্লাহর উপরে গিয়ে তার অসন্তুষ্টি নিয়ে মরে যাব? আর আত্মহত্যা মহাপাপ! যে এই কাজটি করবে, তাকে আখেরাতেও শান্তি দেওয়া হবে না। আচ্ছা, আপনি আত্মহত্যার কথা কেন বলছেন?’
‘সারাদিন সময় কাটান কিভাবে?’
‘সময় কোথা থেকে চলে যায় টেরই পাই না। দিনশেষে আফসোস হয়, কোনো ভালো কাজ করতে পারলাম না! অথচ সময় চলে গেল!’
‘কিভাবে সময় যায়?’
‘সকালে উঠি। ফজরের নামাজ আদায় করি। থালাবাটি ধুই। ঘর ঝাড়ু দিয়ে রান্না বসাই। কাপড় ধুই। সময় হয়ে যায় খাবারের। সবাই খাবার শেষ করে বাড়ির কাজ করি। জোহরের আজান দিলে নামাজ পড়ি। খাবার খাই। কিছুক্ষণ বসতে বসতে আসর এসে যায়। তারপর মাগরিব। পরক্ষণেই এশা। এর মাঝে টুকিটাকি কাজ, খাওয়া-দাওয়া, গোসল, আরো কত কি ! সময় কোথা থেকে চলে যায় টেরই পাই না! কোন আমলও হয় না!’
‘সেটা আবার কি?’
‘সারাদিন যে কোন একটা ভালো কাজের অভ্যাস করা যাতে আখিরাতে একটা পুরস্কার পাওয়া যায়। যার বাহানা দিয়ে, যেই পুণ্যকে উসিলা করে ক্ষমাপ্রার্থনা করা যায়, জান্নাতে প্রবেশ করা যায়।’
‘আপনি কী পুরস্কার চান?’
‘আমি শুধু মৃত্যুর পরে সাথে সাথেই জান্নাতুল ফেরদাউসে যেতে চাই।’
‘কেন? সাথে সাথেই কেন?’
‘কারণ যতক্ষণ দেরি হবে ততক্ষণ শাস্তি হবে, আর আমি কোন শাস্তি চাই না।’
‘শাস্তি যেন না হয় তার কোন উপায় নেই?’
‘অবশ্যই আছে।’
‘কি?’
‘দুনিয়াতে থাকাকালীন মৃত্যুর আগে আল্লাহ তার রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জন করা।’
‘তা কিভাবে করা যায়?’
‘নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কালেমা এই পাঁচটি জিনিস ইমানের মূল ভিত্তি। এগুলো সুচারুরূপে সম্পাদন করলেই সন্তুষ্টি আশা করা যায়।’
‘সন্তষ্টি অর্জনের পন্থা এগুলোই শুধু?’
‘আরো অনেক আছে। জিকির করতে হবে এমনভাবে যে, আপনার জিকিরে কম্পন উঠে যায়। এক সেকেন্ড যেন আপনার কলব খালি না থাকে। আল্লাহর ইবাদতে এমন একটি আমল করবেন, যেটা আপনাকে মনজিলে নিয়ে যাবে।’
‘আর এসব তো জীবিত থেকেই করা লাগবে! না?’
‘অবশ্যই আমাদের সুযোগ দেয়া হবে এই জীবিত সময়টুকুই তারপর হিসাব শুরু।’
‘তাহলে তো আর আমার সুযোগ নেই!’
‘কেন? আপনি এখন থেকেই তওবা করুন, এবাদত করুন, আমল করুন, একদিন আল্লাহ আপনাকে মাফ করবেনই।’
‘আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবেন না। আমি ক্ষমার যোগ্য না।’
‘আমার আল্লাহ অসীম দয়াময়, তার কাছে দয়ার শেষ নেই। তার কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইলেই তিনি ক্ষমা করে দেন।’
‘আমার কোন ক্ষমা নেই আমি অযোগ্য!’
‘কেন আপনি কি করেছেন?’
‘আমি আত্মহত্যা করেছি! দুই বছর আগে!’
‘আস্তাগফিরুল্লাহ!’

