‘কি রে সদুল, মন খারাপ কইরা বইসা আছোস্ যে!’
‘আর বলিস না রে মনা, স্যাংশন খাইছি।’
‘বলিস কি? তুই তো তাইলে শ্যাষ!’
ছোট বেলার বন্ধু সদুলকে সহানুভূতি জানাতে আর কি বলা উচিৎ ভেবে পায় না মনোয়ার হোসেন ওরফে মনা। এক প্যাকেট ড্রাই কেক নিয়ে দু কাপ চায়ের অর্ডার দেয়।
ভ্যান চালক মনা প্রতিদিন সকালে বাড়ী থেকে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে এসে মোড়ের চায়ের দোকানে বসে আরাম করে এক কাপ চা খেয়ে কাজ শুরু করে। এত সকালে সদুলকে চায়ের দোকানে দেখেনি কোন দিন। আজ বিমর্ষ দোস্তকে দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। বাল্য বন্ধুর দুর্দিন, তার কাছ থেকে অনেক খেয়েছে। দিল দরিয়া সদুল উপস্থিত আছে আর এলাকার কেউ চা খেয়ে বিল দিয়েছে, তা হয়নি কোনদিন। সবার বিল সদুল পেমেন্ট করে। আজ জোর করে কেক খাইয়ে দাম মিটিয়ে দেয় মনা।
সাইদুল ইসলাম সদুল এলাকার নেতা। এক সময় টেক্সটাইল মিলের ফোরম্যান ছিল। মালিকপক্ষ মিল বন্ধ করে দিলে চাকরি হারায়। বড় মেয়ে মুসকান ক্লাস সেভেনে, ছোট মেয়ে ক্লাস থ্রি। বেকার সদুল চোখে অন্ধকার দেখে।
তুলা ব্যবসায়ী আবু তালেবের কন্যা আনিসা খাতুন অনার্স পাশ করেছে, এস এস সি পাশ সাইদুল ইসলামের সাথে বিয়েতে অমত করলেও বাবার ইছাকে প্রধান্য দিয়ে বিয়ে করেছিল সদুলকে। সাইদুলের সংসারের হাল ধরে। আর পাঁচটা শিক্ষিত গ্রাম্য বধূর মত প্রাইমারী স্কুলের চাকরির চেষ্টা করে আশা ছেড়ে দিয়েছে। বাবার কাছ থেকে এটা ওটা চেয়ে এনে সদুলের বেকার দিনের সংসার টিকিয়ে রেখেছে।
স্থানীয় এমপি সাহেবের ছোট চাচীর দিকের একটা আত্মীয়তার লিংক আছে সদুলের সাথে। মামা-ভাংগ্নে সম্পর্ক। মামার কাছে ধর্না দিয়ে পড়ে থাকে একটা কাজের জন্য। এর মধ্যে প্রধান মন্ত্রী আসছেন এলাকায়। এমপি সাহেব জনসভায় সদুলকে তাদের গ্রাম থেকে লোক আনার কন্ট্রাক্ট দেন। সদুলের পারদর্শিতায় মুগ্ধ এমপি। এমপি সাহেবের ছবি সম্বলিত সাদা গেঞ্জি, মাথায় লাল সবুজের ফ্যাটা বাঁধা ৫০০ লোক নিয়ে ব্যান্ড পার্টি সহকারে ঢাক ঢোল এর তালে তালে জয় বাংলার গান বাঁজাতে বাঁজাতে জনসভায় উপস্থিত সদুল। মুগাম্বো খুশ হুয়া। সদুলের উত্থান শুরু।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার চলছে। স্বাক্ষী হতে পারলে ঢাকার হোটেলে থাকা খাওয়া ফ্রী, সাথে নগদ নারায়ন। সদুল মামার কাছে মনের ইছা ব্যাক্ত করলে, কথা বলার আর্ট এ মুগ্ধ এমপি সাব রিকমেন্ড করে। কিন্তু প্রসিকিউটর তার বয়স বিবেচনায় নাকচ করে দেন। এই নিউজটা গ্রামে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সদুলের নতুন নামকরণ হয় ‘চালু মাল’ ।
চালু মাল, এমপি সাবের খাস্ লোক হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠল ক’দিনের মধ্যে। পোশাকে আশাক, চলন বলনে পরিবর্তন এসেছে। রোডের একটা কাজ নিয়ে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ঝামেলা করছিল। অফিসে তাকে এক থাপ্পড় মেরে পত্রিকার হেড লাইন হয়েছে। বেড়ে গেছে সদুলের পজিশন। উপজেলা পরিষদে বাড়তি সম্মান পায় এখন। সারাদিন মটর সাইকেল চালাতে আর কার ভাল লাগে। নতুন গাড়ী কিনেছে সদুল।
আনিসা খাতুন এখন গাড়ী নিয়ে বাবার সাথে দেখা করতে যায়। দেখে আবু তালেব শান্তি পান। মেয়ের ইছার বিরুদ্ধে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল ভেবে গর্ব বোধ কর্নে। হীরা চিনতে ভূল করেননি। আনিসার তল পেটে মেদ জমেছে। সকালে কেড্স পরে স্কুল মাঠে হাঁটতে যায়। মেয়েকে সাথে নিয়ে উপজেলা সদরে সাজতে যায় বিউটি পার্লারে। সুখের নহর বইছে তাদের সংসারে।
নতুন টাকা পয়সা হলে কেউ আর গ্রামে থাকতে চায় না। শহর মুখী হয়। সদুল ব্যতিক্রম। গ্রামের লোকদের সাথে মিশে থাকতে চায়। মনে মধ্য সুপ্ত বাসনা জেগেছে, সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। মামা নৌকার মনোনয়ন দিবে। তাকে না দিয়ে যেতে পারবে না। বর্তমান চেয়ারম্যান ১০ লাখ দিয়ে মনোনয়ন কিনেছিল, সদুলকে টাকা দিতে হবে না। এমপি সাহেবের গোপন তথ্য তার কাছে জমা আছে। অতএব নৌকা যার চেয়ার তার। নো চিন্তা, ডু ফুর্তি।
ইউ টিউবাররা প্রতিদিনই বিভিন্ন জনকে স্যাংশন দিছে। সবার হাতে এন্ড্রয়েড সেট। গ্লোবাল ভিলেজ এখানে গোপালী ভিলেজ। যে কোন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ছে মুহুর্তের মধ্যে। টিভি টক শো এর চেয়ে জনপ্রিয় এখন টি স্টল শো। চুল চেরা বিশ্লেষন চলে। সদুলের পোষ্ট মর্টম হয়ে গেল – চালু মাল। টাকা সরিয়ে রেখে এসেছে আমেরিকায়।
একটা কেসে পড়ে গা ঢাকা দিতে এমপি সাহেবের পরামর্শে সিংগাপুরে ছিল মাস তিনেক। দু মাস হল ফিরে এসে গল্প ছড়িয়েছে, ‘আমেরিকা-কানাডা ঘুরে এলাম’। মানুষ সে কথার স্মরণ করে বলাবলি করছে,
‘কত টাকা ধরা খাইছে?’
‘পঞ্চাশ কোটি, একশ, দুইশ, তিনশ কোটি! যে যেমন পারছে চালু মালের ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করে পুলকিত হছে। ঠিক হইছে। ফইন্নির পোলার মাটিতে পা পড়ে না।’
সদুলের ছবি সহ একজন ফেস বুকে পোষ্ট দিয়েছে, ‘জনপ্রিয় নেতা সাইদুল ইসলাম সুদুলের উপর উপর স্যাংশান কেন?’ দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে গেল সদুল স্যাংশান খেয়েছে।
নিজেকে একজন বড় কেউকেটা নেতা মনে হছে সদুলের। চেহারায় চিন্তা ক্লিষ্ট দুঃখী মানুষের ভাব ফুটিয়ে তোলে ঘুরে বেড়াছে। যার সাথে দেখা হছে, সিমপ্যাথি দেখিয়ে নরম সুরে কথা বলছে। সদুল হ্যাঁ , না, কিছু না বলে এঞ্জয় করছে মনে মনে। ইলেকশনে কাজে আসবে, মানুষের সিমপ্যাথী ভোট পাওয়া যায়। ইউ এন ও অফিসের সি এ সাহেব অফিসে ডেকে নিয়ে চা খাওয়ালো।
‘সদুল ভাই, কি শুনছি? কত টাকা ধরা খাইলেন?’
‘বাদ দেন তো সি এ সাহেব। সদুল কথা ঘুরিয়ে ফাইলের খোঁজ নেয়।’
খবরটা শুনে শ্বশুর আবু তালেব চিন্তিত হয়ে পড়ে। জামাতা এবার তাকে হজে পাঠানোর কথা। মেয়ের কাছে ফোন করে।
‘হ্যাঁ রে মা, কি শুনছি?’
‘কি শুনেছো আব্বু?’
‘জামাই বাবাজি নাকি স্যাংশন খেয়েছে?’
‘তোমাকেও এ কথা বলেছে?’
‘আমার কাছে কিছু লুকোস না রে মা, সত্যি কথা বল।’
লজ্জায় আনিসার চেহারা লাল হয়ে যায়। কি করে বলবে বাবাকে। আসুক বাড়িতে! আজ ওর একদিন, কি আমার একদিন।
তিন দিন আগে স্বামী স্ত্রী তুমুল ঝগড়া করে। রাতে সদুল স্ত্রীর গায়ে হাত দিলে হাত সরিয়ে দেয়।
‘খবরদার আমাকে ছুঁবে না। তোমাকে স্যাংশন দিলাম।’
দুপা ক্রস করে আনিসা চুপ করে শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে আসল জায়গার ‘লক্’ খুলতে না পেরে সদুল উঠে গিয়ে ড্রইং রুমে শোয়। সেই থেকে দুজনের কথা বন্ধ। এ কথা বাবার কান পর্যন্ত পোঁছেছে! কি লজ্জার কথা!
সদুল বাসায় ফিরতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আনিসা।
‘আব্বুকে আমার নামে কি বলেছো?’
‘কই, আমি তো কিছু বলিনি।’
‘রাতে আমি তোমাকে স্যাংশান দিয়েছি, এ কথা বলনি?’
আনিসাকে জড়িয়ে ধরে হো হো করে হেঁসে উঠে সদুল।
‘সকাল বেলায় আমি শুধু মনা’কে ‘স্যাংশান খাইছি’ বলেছি। বাকিটুকু চায়ের দোকান থেকে।’

