অগ্নির ঘুম ভেঙ্গেছে প্রায় দশ মিনিট হলো। কিন্তু কেন যেন বিছানা ছাড়তে মন চাইছে না। ঘুম ভাঙ্গার পরের এই মিষ্টি আলস্যটুকু সে খুব উপভোগ করে। এ সময় নানান আকাশ কুসুম ব্যাপারে চিন্তা করতে তার বেশ লাগে!
দুম দুম দুম …..এতক্ষন টোকা পড়ছিল দরজায় কিন্তু এবার মনে হয় রওশন আরার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে তাইতো দুই আঙ্গুলের জায়গায় দশ আঙ্গুলের ব্যবহার চলছে, একেবারে মুষ্টিবদ্ধ পর্যায়ে। অগ্নি বিরক্ত হয়ে বিছানা ছাড়ে।
ঘরের দরজা খুলে তাতানো কণ্ঠে মাকে বলে,
-কি করছো আম্মা! কি হয়েছে কী? এটা তো দরজা, আরমানের পিঠ না যে মনের সুখে কিলাবে।
দশ বছরের আরমান ওদের বাসার বুয়ার ছেলে। একটার সঙ্গে একটা ফ্রি অফারে উদ্বুদ্ধ হয়েই রওশন আরা নিজের মায়ের বাড়ি থেকে মা ছেলেকে এনেছিলেন। মা বুয়া হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমানে সমর্থ হলেও ফ্রি আইটেম পুরাই ফ্লপ কিংবা লস প্রজেক্ট বলা চলে। আদুরে বিড়ালছানার মতো দেখতে আরমানকে পেয়ে প্রথমে রওশন আরা বেজায় খুশি হয়েছিলেন।
তার একমাত্র মেয়ে অগ্নি বড় হয়ে গেছে, স্বামী কন্যা দুজনই ব্যস্ত নিজ নিজ কর্মময় ভুবনে। তাই ভেবেছিলেন এই অখন্ড অবসরের শূন্যস্থানটুকু আরমানকে দিয়েই পূরণ করবেন। আরমান আর তার মা আমেনা বাড়িতে প্রবেশের এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বিপুল উৎসাহে আরমানকে পাশের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়ে দিলেন এবং বই খাতা ইউনিফর্ম সব কিনে একেবারে হুলুস্থুল কান্ড ঘটিয়ে দিলেন। তার এই উৎসাহে বিমোহিত হয়ে আমেনা তাকে ধর্মের বোনও ডেকে ফেলল এবং প্রতিশ্রুতি দিলো কোনদিন রওশন আরাকে একা রেখে যাবে না। ছায়াসঙ্গী হয়ে জীবনভর সেবা করে যাবে আপন বোনের মতো। কিন্তু যার জন্য এতো নাটকের অবতারণা সেই আরমানই কিন্তু মূল বিষয়ে ছিল নির্বিকার। দেখা গেল ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাবার মতো পড়াশোনা ডিঙ্গিয়ে টিভি আর কম্পিউটার বিষয়েই তার বিশেষ আগ্রহ।
শুধু যে টিভি কম্পিউটার দেখতে আগ্রহী তা নয়, এসব যন্ত্র কিভাবে বশে আনতে হবে সেই ব্যাপারেও তার আগ্রহ সীমাহীন। ফলে অল্প দিনেই বই খাতার জায়গায় গেম আর কার্টুনে তার জ্ঞানের পরিধি বাড়তে লাগলো এবং সময় বিশেষে নিজের অপারেটিং প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে বাসার এসব বিনোদন যন্ত্র প্রায়ই কম বেশি বিগড়ে যন্ত্রনায় রূপান্তরিত হতে লাগলো। তবে এতে করে আমেনা আর রওশন আরার উৎসাহে ভাটা পড়েনি মোটেও। আমেনা এখন নিজের ছেলেকে শাসন করা ছেড়ে দিয়েছে। তিনি রওশন আরাকে হাইকোর্ট মেনে পুত্রের সকল নালিশ বিচারের কেস তার কাছেই সোপর্দ করে আর তার ফলশ্রুতিতে প্রায়ই আরমানকে উত্তম মধ্যম খেতে হয় রওশন আরার হাতে।
যাই হোক, মূল ঘটনায় ফেরা যাক …..রওশন আরা বিরক্ত মুখে মেয়ের ঘুমজড়ানো চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
-কি হয়েছে মানে? সেই কখন থেকে দরজা পিটাচ্ছি! ঘুম শেষ হয়না কেন তোর?
-আম্মা ….মোটে আটটা বাজে! কালকে তো বললাম আমার এগারোটায় ক্লাস। তাহলে নয়টা পর্যন্ত ঘুমালে সমস্যা কি?
-তোমার ক্লাস নাহয় এগারোটায় কিন্তু তোমার বাপের ক্লাস তো সকাল দশটায়। সেই ভদ্রলোক যে তার মেয়ের মুখদর্শন না করে বাসা থেকে বের হননা সেটা কি তোমার অজানা? সেই কখন থেকে বসে আছে তুই গেলে একসাথে নাশতা করবে আর তুই এদিকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিস!
অগ্নি নিজের ভুলে নিজেই নিজের জিভ কাটে।
-ওহহো! সরি আম্মা। আচ্ছা, তুমি যাও। আমি দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসছি।
অগ্নি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির নাট্যতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অধ্যায়নরত বিষয়ে ব্যাপক দক্ষ অগ্নি ব্যক্তিজীবনেও বেশ নাটুকে মেজাজের। গম রঙ্গা ছিপছিপে দৈহিক গড়নের অগ্নির রূপের অগ্নিবাণে বিদ্ধ হয়না এমন পুরুষ কমই আছে। চলনে বলনে দুষ্ট প্রজাপতির মতোই অস্থির অগ্নি নিজের রূপ আর প্রতিভা সম্পর্কে খুবই সজাগ। তাইতো সে চপল হরিণীর মতো ছুটে বেড়ায় ….চমকে দাঁড়ায় কিন্তু …..দেয়না কাউকে ধরা। দশ মিনিটের কথা বললেও অগ্নি প্রায় আধা ঘন্টা পার করে নাশতার টেবিলে হাজির হয়। ততক্ষনে শফিক সাহেব মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নাশতা খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক শফিক আনোয়ার তার একমাত্র মেয়ে অগ্নিকে প্রানের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। সকালে মেয়ের মুখ না দেখে তিনি বাড়ি থেকে বের হননা।
অগ্নি এসেই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের গালটা বাবার কপালে ঠেকায়।
-গুড মর্নিং বাবা। সরি, তোমাকে অপেক্ষা করালাম অনেকক্ষন।
শফিক সাহেব মৃদু হেসে আদুরে ভঙ্গিতে মেয়ের মসৃন গালে আলতো করে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিয়ে বললেন, – আমি কিন্তু নাশতা করে ফেলেছি মামনি। দশটায় আমার ক্লাস আছে। এখুনি বের হতে হবে। অগ্নি ঘুরে বাবার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে পড়ে।
রওশন আরা মেয়ের প্লেটে পরোটা আর আলুর দম দিয়ে বলেন, – নেও ….বাবা মেয়ের মুখদর্শন পর্ব শেষ হয়ে থাকলে এবার নাশতা খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর।
অগ্নি নাশতার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলে,
-এহ আম্মা! এগুলো কি?
-কেন চিনিস না? পরোটা আর আলুর দম।
-কালকে না আলু ভাজি করলা, আজকে আবার আলুর দম? তুমি তো দেখি আমার জীবনটা আলুময় করে ছাড়বে!
রওশন আরা মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন,
-এতো আলু খাওয়াই তাও তো মোটা হস না। শরীর তো দড়ি দড়ি! সেইদিন আক্কাসের আম্মা আমাকে ডেকে বলেন, ‘মেয়ের স্বাস্থ্য হয় না কেন আপা? মেয়ের দিকে একটু নজর দিও। বিয়ের বয়স হইসে কি হইসে না, স্বাস্থ্য দেখে তো বোঝাই যায় না!’
আক্কাসের মা প্রসঙ্গ উঠতেই অগ্নির সুন্দর মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে যায়। প্রায় আলু সাইজের গোলগাল আক্কাসের মা ওদের প্রতিবেশী। কোন এক অজানা কারণে এই মহিলাকে আর তার ছোট ছেলে আক্কাসকে অগ্নি একদম সহ্য করতে পারেনা। আরেআবডালে আক্কাসকে সে মাইক্রো কক্কাস বলে ডাকে। অগ্নি বিরক্ত মুখে বলে,
-তোমারে না হাজার দিন বলেছি ওই মাইক্রো কক্কাসের মায়ের ফালতু প্যাচালের গল্প আমার কাছে বলবা না? নিজে তো ধুম্সী ….পুরাই লাট্টু! ছেলেটারেও খাওয়ায় দাওয়ায় মিনি লাট্টু বানায় ফেলছে।
-লাট্টু বলিস কেন? ছেলেটার স্বাস্থ্য ভালো। তাছাড়া এতো ভদ্র ছেলে খুব কমই হয়। দেখলেই কেমন আদবের সাথে সালাম দেয়!
-হুহ ….তোমারে দেখলে সালাম দেয় আর আমারে দেখলে লাট্টুর মতো আগে পিছে ঘোরে। সাইজে দুই ফুট কিন্তু হাবে ভাবে শফুট! মাই ফুট ….
-ছিঃ অগ্নি! নিজে দেখতে একটু ভালো বলে অন্যকে এভাবে বলতে হয়? আজ তোর গায়ের রং যদি আক্কাসের মতো ময়লা হতো তাহলে এভাবে বলতে পারতি!
এবার শফিক সাহেবও স্ত্রীকে সমর্থন করে বলেন,
-তাইতো! কারো রং রূপ নিয়ে কটাক্ষ করা একদম ঠিক না মা, এতে তো আর আমাদের কারো হাত নেই। তাছাড়া দূরে যাবার দরকার কি? ধর তুই দেখতে যদি আমার মতো হইতি তাহলে কি হতো একবার ভেবে দেখেছিস?
অগ্নি বাবার দিকে চেয়ে সবজান্তার ভঙ্গিতে বলে,
-বাবা, প্লিজ! তুমি দেখতে কেমন তার চাইতে বেশি জরুরী তোমার উপস্থাপন প্রতিভা কতখানি। তাছাড়া তোমার প্রতিভার কাছে তোমার লুক কোন মানেই রাখেনা। আমিতো সকাল বিকাল আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই যে আল্লাহ আমাকে মায়ের চেহারার সাথে সাথে তোমার বিচার বুদ্ধি দিয়েছে। নইলে মায়ের চেহারার সাথে সাথে যদি তার ব্রেনটাও পেতাম তবে ……
রওশন আরা মেয়ের কথা শেষ হবার আগেই হামলে পড়েন,
-কি বললি? আমার বুদ্ধি বিবেচনা কম?
জবাব না দিয়ে অগ্নি খালি মুখেই লাফ দিয়ে চেয়ার ছাড়ে, তারপর পেছন থেকে এক হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে বাবার বুক পকেট থেকে টাকা বের করে নেয়। চট করে হাতের নোটের উপর নজর বুলিয়ে বলে,
-তিনশো টাকা। উমম …চলবে!
মেয়েকে উঠতে দেখে রওশন আরা হড়বড় করে বলে ওঠেন,
-অগ্নি, নাশতা করে যা।
-ওইসব আলুর রেসিপি তুমি তোমার মাইক্রো কক্কাসের মাকে খেতে দিও। আমি বাইরে থেকে কিছু খেয়ে নেবো। আসি বাবা। রওশন আরা মেয়ের গমনপথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়েন। দিনদিন মেয়েটা বড় অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে।
***
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালের ক্যাম্পাসের পাশেই আবাসিক এলাকায় অগ্নিদের ছোট্ট দোতলা বাড়ি। পাশেই একটা পুকুর আছে। সাধারনত আবাসিক এলাকার পুকুরগুলো বেশ নোংড়া হয়। তবে এই পুকুরটা তেমন নয়। এলাকার বয়েজ ক্লাবের ছেলেরা প্রায়ই বেশ ঘটা করে এটি পরিষ্কার করে। ফলে পুকুরের টলটলে পানি দেখলে যে কেউ এর ঘাটে এলে জলে পা ডুবিয়ে খানিক্ষন বসার ইচ্ছা পোষন করবে।
পাশেই মসজিদ, তাই মসজিদ কমিটির সবাই মিলে খুব সুন্দর করে এর ঘাট বাঁধাই করে দিয়েছে। পাঁচবেলা মুসুল্লিরা এখানেই ওযু করে। অগ্নিদের বাড়ির সামনেই একটা ছোট্ট খেলার মাঠ রয়েছে। সকাল বিকেল সেখানে নানা বয়সের ছেলেপুলে থাকেই থাকে। সবমিলিয়ে অগ্নিদের বাড়ির আশেপাশের পরিবেশটা বেশ! তাইতো ক্যাম্পাসে থাকার সুবিধা অগ্রাহ্য করে শফিক সাহেব নিজ বাড়িতেই থাকেন। অগ্নির নিজ ঘরের ছোট্ট ব্যালকনিটা খুব প্রিয়। অলস বিকেলের বেশকিছুটা সময় সে এখানে কাটায়। ওদের বাড়ি লাগোয়া একমাত্র বাড়িটা আক্কাসদের। বাড়িটা তিনতলা। পুরো বাড়িটা জুড়ে আক্কাসরাই থাকে।
এমনিতেই তারা সাত ভাই বোন। তাছাড়া তাদের বাড়িতে বারোমাস মেহমানের আনাগোনা লেগেই থাকে। ফলে পুরো বাড়িটাকে বাড়ি না বলে আবাসিক হোটেল বলাই ভালো। আক্কাসের আম্মা মোটাসোটা জাঁদরেল টাইপ মহিলা। সারাদিন রান্না খাওয়া আর পাড়া বেড়ানো ছাড়া আর একটি কাজ উনি বেশ নিষ্ঠার সাথে করেন, সেটা হচ্ছে ঘরদোর পরিষ্কার করা। তাদের বাড়ির সামনে যে ছোট্ট একফালি উঠান মতো আছে সেটাও সে দিনে দশবার চাকরবাকর দিয়ে ধুয়ে মুছে চকচকে করে রাখেন।
আর অগ্নির অবসরের একটি চমৎকার বিনোদন ব্যবস্থা হচ্ছে সবার অগোচরে সেখানে এটা সেটা ফেলে মহিলার কুমড়ো পটাশ শরীরের লম্ফঝম্ফ দেখা। হয়তো একটা কলার খোসা কিংবা একমুঠো চিপস ……ফেলে দিয়ে অগ্নি নির্বিকার চেহারা করে তার বারান্দায় রাখা দোলনায় বসে দোল খায় আর আরপ্লাগে গান শোনার মিথ্যে অভিনয় করে। ময়লা চোখে পড়তেই মহিলা তার ভারী শরীরটা নিয়ে চিলের মতো ছুটে এসে বাড়ির সব চাকরবাকরকে বকাঝকা শুরু করেন।
তার ধারণা, তার বিরাট চাকর সমাজেরই কেউ এসব অপকর্ম করে, তাই দোষ সর্বদা তাদের ঘাড়েই পড়ে। আজও অগ্নি করার কিছু পাচ্ছেনা তাই বিনোদনের আশায় একটু আগে খেয়ে রাখা লিচুর খোসাগুলো নিয়ে এলো। সন্ধ্যা হয় হয় ….খেলার মাঠ ছাড়া আশপাশটা মোটামুটি দিনশেষে ঝিমিয়ে পড়েছে। এটাই সুযোগ। একটু আগে অগ্নি আক্কাসের মাকে বাইরে যেতে দেখেছে। মাগরিবের নামাজের সময় মহিলা নিশ্চই বাড়ি ফিরবেন। আর ফিরেই উঠোনে ময়লা দেখে মহিলা যে কি করবেন সেই দৃশ্য কল্পনা করেই অগ্নির হাসি পাচ্ছে ভীষণ!
সে ভাল করে আশপাশটা দেখে নেয়। নাহ, কেউ দেখছে না। এটাই মোক্ষম সুযোগ। সে সাবধানে খেলার মাঠের দিকে চোখ রেখে পলিথিনের সবটুকু লিচুর খোসা ছুঁড়ে মারে আক্কাসদের উঠানের দিকে।
কিন্তু সাথে সাথেই শুনতে পায়,
– ওহ মাই গড! এসব কি!
একটা ভরাট পুরুষালী কন্ঠের চাপা গুঞ্জনে অগ্নির পিলে চমকে ওঠে ভরসন্ধ্যায়। তবে কি উঠানে কেউ ছিল?
চলবে ……..

