ঘুমটা হঠাৎ করে ভেঙ্গে গেল প্রবল তৃষ্ণা যেন জোর ঝাঁকুনী মেরে ডেকে তুলল আমাকে। কিন্তু অত তৃষ্ণা সত্ত্বেও বিছানার আলস্য ছেড়ে নড়তে চড়তে মন করছে না। বেশ কিছুক্ষন এপাশ ওপাশ করলাম, ভাবলাম তৃষ্ণাটা মরে গেলে ঘুমটা চলে আসবে আবার, কিন্তু বিধি বাম! তৃষ্ণাটা যে সত্যি খুব জোরদার হয়ে ঘাড়ে থুড়ি গলায়, বুকে চেপে বসেছে তা বিলক্ষণ টের পেয়ে অগত্যা উঠে বসলাম।
মশারীর নিচ থেকে আস্তে ধীরে বের হয়ে ধীরে সুস্থে হেঁটে বের হলাম নিজের ঘর থেকে। বের হয়ে প্রথমেই নজর গেল ডায়নিং টেবিলটার ওপর। অবাক করা কান্ড! ডায়নিং টেবিল আর আমার মাঝখানে বিশাল একখানা স্টিলের গেট আসল কোনখান থেকে? তারওপর তাতে ঝুলছে বিশাল একখানা তালা! হঠাৎ বুঝতে পারলাম ঘুমের ঘোরে নিজের বাড়িতে আছি মনে করলেও আসলে আমি আছি কোন এক জাহাজে! কিন্তু জাহাজেই বা ডায়নিং রুম অমনভাবে তালা মারা কেন থাকবে? তাছাড়া আমি আছি জাহাজের প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটে, সেখান থেকে ডায়নিং টেবিল দেখাই বা যাবে কি করে? মাথাটা কেমন এলোমেলো লাগছে। তৃষ্ণাটা মনে হচ্ছে এতক্ষনে কিছুটা মরে এসেছে। তবুও লোভীর মত করে আরেকবার তাকালাম ডায়নিং টেবিলে রাখা পানির জগ গ্লাসগুলোর দিকে।
তারপর অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাকিয়ে চলে এলাম ঘরে। মজার ব্যাপার ঘরটাকে এখন আমার নিজের বাসার বেডরুমের মতই মনে হতে লাগল আবার! জানি না তৃষ্ণা না ঘুম কোনটার ঘোরে অমন আবোল তাবোল মনে হচ্ছে সবকিছুকে! যাই হোক এখন ঘুমিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভেবে তাড়াতাড়ি বিছানায় শুয়ে পড়লাম কাঁথাটা টেনে নিয়ে।
পানির গন্ধটা নাকে বেশ চনমনে অনুভূতি এনে দিল আমার। নীল রঙা ম্যালামাইনের গ্লাসটা মাথার কাছে দেখতে পেয়ে ওটা কে দিল, কি করে দিল অত আর ভাবতে পারছিলাম না। ঢক ঢক করে পানির গ্লাসটা নিঃশেষ করে ফেললাম একদমে। আহ্, কি শান্তি! আরামে চোখদুটো অজান্তেই বুজে আসল, আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে কোনরকম হাতটা দিয়ে গ্লাসটা সাহায্যকারীর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। এমনকি আলস্যের অতিশয্যে তারদিকে পাশটাও ফিরলাম না। বুঝতে পারলাম খাটের পাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াক, গ্লাসটা নিয়েই চলে যাবেক্ষণ!
একটা হাত এগিয়ে এল খুব সন্তর্পণে। কিন্তু ওমা হচ্ছেটা কি এসব? কোথায় গ্লাসটা নেবে তা না আমার পেটের ওপর সাপের মত করে পেঁচিয়ে ধরতে লাগল ওটা। আমি তখনও প্রাণপনে চোখ দুটোকে টিপে বন্ধ করে রেখেছি। বুঝতে পারছি হাতটার ইচ্ছে আমাকে খাট থেকে টেনে নামিয়ে নেওয়া। আমিও গ্লাস ছেড়ে দিয়ে বিছানা, বালিশ যা পাচ্ছি হাতের কাছে তাই আঁকড়ে ধরে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে চলেছি। নাহ্ , শেষতক হাতটার অসুরিক শক্তির সাথে আর পেরে উঠলাম না। ঘুরে যেতে বাধ্য হলাম যেদিক থেকে টানটা আসছে সেদিকে। এখনও আমার দুচোখ টিপে বন্ধ করা, যেন চোখে দেখতে পেলেই আমার সব জারিজুরি খতম হয়ে যাবে! হঠাৎ হ্যাচকা টানে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না, মশারী টশারী ছিঁড়ে সবশুদ্ধ হুড়মুড় করে পড়লাম খাট থেকে। বুঝতে পারলাম যে টানছিল সে আমার নিচে চাপা পড়ল। এতক্ষনে আমার দুচোখ আর বন্ধ থাকতে না পেরে অগত্যা বিস্ফারিত হল। সাথে সাথে তীব্র আতঙ্ক আমাকে হতবুদ্ধি করে ফেলল!
আমি তাকে অনুভব করতে পারছি, বুঝতে পারছি তার প্রথম উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। কিন্তু চোখে দেখতে পাচ্ছি না তাকে! বুঝতে পারলাম ভয়ানক কোন অশরীরীর হাতে বন্দি হয়ে গেছি আমি, কারন ততক্ষনে সে আমাকে কাঁথা মশারী সবশুদ্ধ পেঁচিয়ে ধরেছে খুব শক্ত করে। আমার হাড়গোড়গুলো যেন মুড়মুড় করে শব্দ করে উঠল সে চাপে। নিঃশ্বাস ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে আমার তবুও মনে হচ্ছে কিছু একটা করার আছে আমার। বাঁচার প্রবল আঁকুতিতে শরীরের সব জোর গলায় এনে জড়ো করলাম। বুক ঠেলে চিৎকারটা আকাশ বাতাস সব ফাঁটিয়ে দিয়ে বের হতে চাইল। কিন্তু যে শব্দটা ছিটকে বের হল তার সাথে হাতির নিনাদের চেয়ে বরং ইঁদুরের চিঁ চিঁ শব্দেরই বেশি মিল পাওয়া গেল। কিন্তু শব্দটা যেমনই হোক আমাকে বাঁচিয়ে দিল এ যাত্রায়। দুঃস্বপ্নের ঘোর থেকে মুক্ত নিজেকে বাস্তবে ফিরে পেয়ে সস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম অবশেষে। আতঙ্কটা তখনও সমস্ত অস্তিতে যেন ভেঁজা কাপড়ের মত করে জড়িয়ে আছে! একটু স্থির হতেই টের পেলাম গলাটা আসলেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে । কাঁপা হাতে মোবাইলটা তুলে দেখলাম রাত ঠিক তিনটা বাজে! চারিদিকে শুনশান নিরবতা আর ঘনঘোর অন্ধকার! তৃষ্ণাটা প্রবলভাবে নিজেকে জানান দিতেই আতঙ্কটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আবার ।
সত্যি কি আমি দুঃস্বপ্নের নগর থেকে ফিরে আসতে পেরেছি? নাকি দুষ্টচক্রের মত তৃষ্ণার পরে ভয়ানক অশরীরীর অস্তিত্ব আবার আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে কোন অচেনা ভয়াল খাঁদে?

