ভিক্টরের বুকের ভেতরে ধকধক শব্দ হচ্ছে।
এখন ভীষণ আতঙ্কিত ভিক্টর। শুধু ও নয়, মুন্সীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর মধ্যেই থমথমে ভাব।
প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ ছুটির পরও ক্লাসে থাকতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের মনে ভয় জাগে তাহলে কি টিকাওয়ালা এসেছে ওদের টিকা দিতে। ইনজেকশনের সূঁচটা ছাত্রছাত্রীদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ছাত্র-ছাত্রীরা এ ভয় বুকে নিয়েই সময় পার করছে।
মওলা মুহাম্মদ স্যার এখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে ডাকে মওলা স্যার। গাঁয়ের মানুষ বলে মওলা মাস্টার। তিনি বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে পণ্ডিত। ছড়া, কবিতা, রূপকথার গল্প, পাঠ্যবইয়ের গল্প খুব সুন্দর করে পড়ান। তাঁর পড়া শুনে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে পিনপতন নীরবতা। যেন নিশ্বাসের শব্দও হয় না আর।
ভুলেও মওলা স্যারের মুখের দিক থেকে চোখ ফেরায় না কেউ।
মওলা স্যার আজ ঢিলেঢালা প্যান্টের ওপর পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। শাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ওপর হাতাকাটা কোট পরা। ছাত্রছাত্রীরা শুনেছে, এ কোটের নাম মুজিব কোট। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভক্ত মওলা স্যার। স্যার যেখানেই যান না কেন, পাঞ্জাবির ওপর এ কোট থাকেই।
ভিক্টরও এমন পোশাক খুব পছন্দ করে। ও ভেবে রেখেছে যখন বড় হবে তখন পাঞ্জাবির ওপর সবসময় মুজিব কোট পরবে।
সকালে স্কুলে এসেই শুনেছিল পরশু শহীদ দিবস পালিত হবে। সবাই ফুল দেবে শহীদ মিনারে। মনের কোণে এমন শঙ্কাও দেখা দিয়েছিল ওর হেডস্যার কি সত্যি সত্যি এ স্কুলে শহীদ দিবস পালন করতে দেবেন?
শহীদ দিবস! শহীদ দিবস!
বারকয়েক উচ্চারণ করে ভিক্টর। জানালা গলিয়ে চোখ চলে যায় স্কুল মাঠে।
মাঠের পুবপাশে একটা ফুল গাছ। ফুলের নাম টগর ফুল। তারপাশেই গৌরবের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনারটা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় ভিক্টরের। পরক্ষণে ওর মনটা খারাপও হয়ে ওঠে একটা কিছু লক্ষ্য করে। শহীদ মিনারের বেদিটার আশপাশে কত রকমের গাছ-পালা গজিয়ে উঠেছে। আর শহীদ মিনারের গায়ে জড়িয়ে আছে কত কত লতা-পাতা। বেদিটার এখানে ওখানে প্লাস্টার উঠে গেছে। ভিতরের ইট দেখা যাচ্ছে। আর সেখানে নানা রকমের ঘাসও গজিয়ে উঠেছে। বেদীর সামনে ময়লা পানির নালা। বিশাসবাড়ির গরুর গোয়ালের মলমূত্র এ নালা বেয়ে আসে এখানে। কী দুর্গন্ধ!
‘এই ভিক্টর, ঘুমাচ্ছিস নাকি?’ ধমকিয়ে ওঠেন বাংলার শিক্ষক মওলা মুহম্মদ স্যার।
মুহূর্তের মধ্যে জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় ভিক্টর। আমতা আমতা করে ও। তারপর ভয়ে ভয়ে ওঠে দাঁড়ায়। ‘না না স্যার। আমি… মানে.. আমি।’ ভয়ে তোঁতলাতে থাকে ভিক্টর।
মওলা মুহম্মদ স্যার আবার ধমক দেন। চোখ রাঙিয়ে তাকান। বলেন, ‘স্কুল মাঠে গরুর রাখালদের গরু-ছাগল চরানো দেখছিস, তাই না?’
ফ্যালফ্যাল চোখে স্যারের মুখ পানে তাকিয়ে থাকে ভিক্টর। ভয়ে বুকটা ধকধক করছে ওর।
ভিক্টরের আচমকা এমন আলুথালু ভাব দেখে ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা হেসে ওঠে। কারো হাসি যেন থামছেই না।
মওলা মুহম্মদ স্যারের হাতে ডাস্টার। তিনি হাতের ডাস্টার দিয়ে বারকয়েক টেবিলের ওপর চাপড় মারলেন।
চাঁদনী হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। বলল, ‘স্যার দেখেন, ভিক্টরকে আজ পাগলের মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে ও একটা গো-মূর্খ।
শ্রেণিকক্ষের সব ছাত্রছাত্রী হেসে ওঠে চাঁদনীর কথা শুনে।
মওলা মুহম্মদ স্যার আড়চোখে আরেকবার ভিক্টরের দিকে তাকালেন। ‘কী রে, রাতে ঘুমাস না? নিশাচর বাদুর হয়ে গেছিস না কি আজকাল?’
ভিক্টর কথা বলে না। স্যারের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে।
আঁতকে ওঠে ভিক্টর। মওলা মুহম্মদ স্যার কিভাবে যেন তার গোপন ব্যাপারটা ধরে ফেলেছেন। ঠিকই তো। গত রাতে সে রাত ৮টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। তারপর ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে হাবলু মিঁউ মিঁউ করে বিড়াল ডেকেছিল। এটাই ছিল ওদের গোপন সংকেত।
মোজাম্মেল মেম্বারের কাঁটাতারের আম বাগানে মন্টু ম্যাজেশিয়ানের ম্যাজিক শো-চলছিল। মাইকে যখন ঘোষণা হচ্ছিল, “আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ম্যাজিক শো শুরু হয়ে যাবে। যরা অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করছেন তারা টিকিট কেটে পেন্ডেলের ভেতরে প্রবেশ করুন। একটু পরেই আমাদের বিখ্যাত মন্টু ম্যাজেশিয়ান মন্ত্রের সাহায্যে আকাশ থেকে এক ঝাঁক পরী নামিয়ে আনবেন। আসুন! আসুন! নিজ চোখে এমন আশ্চর্য ঘটনা দেখুন।” এসব শুনে আর স্থির থাকতে পারেনি ভিক্টর।
মা-বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাবলুর সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে।
মনে মনে ভিক্টর ভাবে তাহলে কি গত রাতের ব্যাপারটা কেউ মওলা স্যারের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
ভিক্টরদের ক্লাসে সবসময় সেকেন্ড হয় মাহফুজা। সে বলল, ‘স্যার ভিক্টর কিন্তু কিশোর ভাষাশহীদ অহিউল্লাহর অমর মতো হতে চায়। সেও নাকি দেশের জন্য প্রাণ দেবে।’
মাহফুজার সঙ্গে সবসময় ঝগড়া লেগেই থাকে ভিক্টরের। দু’জনের সঙ্গে যেন সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ক্লাসে প্রথম স্থান আর দ্বিতীয় স্থান অর্জনকাীর মধ্যে কী আর বন্ধুত্ব হয়? যে প্রথম হয় সে সবসময় ভাবে দ্বিতীয়কে তার স্থান কেড়ে নিতে দেব না আর দ্বিতীয় ভাবে প্রথমের জায়গাটা কেড়ে নেব। ভিক্টর আর মাহফুজার মধ্যে দ্বন্দ্বটা হলো এটাই। শুধ এ বছর নয়, সেই প্রথম শ্রেণি থেকেই প্রতিবছর ফার্স্ট হয় ভিক্টর। সেকেন্ড মাহফুজা। আর থার্ড আব্দুল মজিদ।
মাহফুজার কথা শুনে মওলা মুহম্মদ স্যার বললেন, ‘হ্যাঁ, মাহফুজা। কথাটা ঠিকই বলেছে ভিক্টর। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সবটাতেই তো ছাত্রছাত্রীদের অবদান চিরগৌরবের। ভিক্টর হতে চাইলে সেটা তো অনেক গৌরবের ব্যাপার।
মাহফুজার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
মওলা মুহম্মদ স্যার বললেন, ‘তবে শোনো সবাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অহিউল্লাহ নামে একজন কিশোর শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা বাংলায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল সেনাসরকার। ছাত্র-জনতা সেদিন “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”-এর দাবিতে মিছিল বের করেছিল। সর্বপ্রথম লালবাগ এলাকা থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করে। পুলিশ সেই মিছিলে লাঠিচার্জ করে ছাত্রছাত্রীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
মুগ্ধ হয়ে মওলা মুহম্মদ স্যারের কথাগুলো শুনছিল ক্লাসের শিক্ষার্থীরা। তিনি ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আরো ইতিহাস শোনালেন। শেষে বললেন, ‘আজ ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখ। আগামীকাল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। যাকে বলে শহীদ দিবস।’
ইয়াসনবী ঘন ঘন হাই তুলছিল। তার চোখে স্যারের চোখ পড়তেই ভয়ে কেঁপে ওঠে। সে ধরা পড়ে গেছে দেখে দ্রুত দাঁড়িয়ে সাহসী গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার, আমাদের স্কুলে কি ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা হবে না?’
মওলা মুহম্মদ স্যার কিছুক্ষণ ভাবলেন। তিনি এখন হাঁটতে হাঁটতে শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
বারবার গত রাতে কিভাবে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল সেটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মাইকের শব্দ শুনে ভিক্টরের আর পড়ায় মন বসছিল না। ওদিকে আবার হাবলুর ডাকার সংকেত। মনটা নেচে উঠেছিল ম্যাজিক শো দেখতে যাওয়ার জন্য। ওর আর তর সইছিল না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিল বাবা যখনি মসজিদ থেকে বের হবে, তখনি ও হাবলুর সঙ্গে পালাবে। ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে হাবলু চুপি চুপি বিড়ালের মতো মিঁউ মিঁউ করে ডেকেই চলে ছিল। ভিক্টরের ভাগ্যটা ভালোই ছিল। ওর বাবা একটু আগেভাগেই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে চলে গিয়েছিলেন। এ সুযোগে ভিক্টর দ্রুত বই-খাতা গুটিয়ে পালিয়েছিল। ও আর হাবলু আবছা অন্ধারের মধ্যদিয়ে দৌড়াচ্ছিল। প্রথমে ইউসুফ মোড়লের উঠোন। তারপর আবু দোকানদারদের তেঁতুলতলা। দৌড় তো দৌড়ই। পুল পার হয়ে মুনসুর মেম্বারদের নিমতলায় এসে দম নেয়। হাবলু ম্যাজিকে পেন্ডেলে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। তাই আবার দৌড় শুরু করে। তেমাথা ছাড়িয়ে সোজা খসু বালতির উঠোনে পৌঁছে।
এখানে একেবারে ফকফকা আলো। হাবলুকে সঙ্গে নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত ম্যাজিক শোর প্যান্ডেলে ছিল ভিক্টর।
আবারো হাই তুলল ভিক্টর।
মওলা মুহম্মদ স্যার তড়িঘড়ি উঠে এলেন। ‘এই বান্দর, পড়াশোনায় কি তোর একটুও মনোযোগ নেই? আমি এখন উনিশশো বায়ান্ন সালের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়াচ্ছি। আর তুই কিনা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস? মেরে তোর হাড়গোড় ভেঙে দেব।’
ভিক্টর স্যারের কথা শুনে ভয়ে কাঁপতে লাগল। গলার স্বর নিচু করে বলল, ‘না স্যার, আমি ঘুমাচ্ছিল না। আপনার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছি।’
কী যেন ভাবলেন মওলা মুহম্মদ স্যার। তারপর বললেন, ‘কয়েকজন ভাষা শহীদের নাম বল তো?
ভিক্টর পড়াশোনায় খুবই ভালো। ওর অ্যাডভেঞ্চারের দিকে একটু ঝোঁক আছে বেশি সেটা সত্যি কিন্তু পড়াশোনায় কখনো ফাঁকি দেয় না।
ভিক্টর বলল, ‘সালাম, বরকত, রফিক, শফিক ও জব্বার।’
মওলা মুহম্মদ স্যার খুশি হলেন ভিক্টরের উত্তর শুনে।
ভিক্টর বলল, ‘স্যার, আপনিও কি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য মিছিল করেছিলেন?’
ভিক্টরের কথার কী জবাব দেবে তা ভেবে পাচ্ছেন না মওলা মুহম্মদ স্যার। তিনি একটা জোরে নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর মনে পড়ে গেল সেই কলেজ জীবনের কথা। টাঙ্গাইল জেলার মনিপুর গ্রামে সরদার পরিবারে তাঁর জন্ম। সরদার গোষ্ঠীর বেশিরভাগ পরিবারই ধনী। সেই পরিবারে তিনি প্রথম মেট্রিক পাস করেছিলেন। বড় বড় কয়েকটি খাশি জবাই করে শিক্ষক ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খাওয়ানো হয়েছিল। তিনি পরে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। আর তখন দেশ ছিল উত্তাল। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হবো হবো ভাব। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি নয় মাস যুদ্ধ করল। ত্রিশ লাখ বাঙালি শহীদ হলেন। সম্মান হারালেন ২ লাখ মা-বোন। তারপর এলো বাঙালির মুক্তির দিন।
মওলা মুহম্মদ স্যার জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেন স্কুলে মাঠের দিকে। সবুজ ঘাসে ছেয়ে গেছে ছাত্র-ছাত্রীদের খেলার মাঠটি। ওই তো টগর ফুলের গাছটি। তার পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাঙালির চির গৌরবের শহীদ মিনার। বছরে একবার শুধু এই শহীদ মিনারটার কথা মনে পড়ে সবার।
ভাষাশহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা কিভাবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছি সে কথা ভুলে যায় সবাই। যে মাতৃভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছিল একদিন, তাঁদের কথা আমরা এখন আর কেউ স্মরণ করি না। কত মায়ের যে সেদিন বুক খালি হয়েছিল, তা এখন তামরা আর কেউ মনে করি না।
মাহফুজা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, তাহলে কি আমাদের স্কুল আগামী পরশু শহীদ দিবস উদযাপন করা হবে না?’
মওলা মুহম্মদ স্যার উদাসীন হয়ে পড়লেন। তিনি বিড়বিড় করলেন। একটা টানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর মুখমণ্ডল ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। তিনি ঘামছিলেন। তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে পানের কৌটা। সেটা বের করে একটা পান নিয়ে মুখে দিলেন। এবার অন্য কৌটা থেকে এক চিমটি জর্দা নিলেন। তারপর মুখে দিয়ে চিবুলেন খানিকক্ষণ।
শ্রেণিকক্ষটা এখন জর্দার ঘ্রানে মৌ মৌ করছে।
হেডস্যারের নিষেধ হচ্ছে ক্লাসরুমে ধুমপান করা আর জর্দা দিয়ে পান খাওয়া সমান ব্যাপার। এটাও বড়সড়ো অপরাধ। শতবার হেডস্যার নিষেধ নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি এই বদভ্যাসটা ছাড়তে পারেননি। শেষমেশ হেডস্যার এ ব্যাপারে মাথা ঘামানো বাদ দিয়ে দিয়েছেন। আর তিনি মওলা মুহম্মদ স্যারের চাকরির বয়সটার কথাও মাথায় রেখেছেন। এই তো আর বছর দুয়েক পরেই তিনি অবসরে চলে যাবেন। এই বয়সে একটু-আধটু পান-তামাক খাওয়া দোষের কিছু নয়।
মওলা মুহম্মদ স্যার মেট্রিক পাস করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ও ইতিহাস বিষয় পড়ান। তাঁর ধারণা যারা বাংলা ও ইতিহাস পড়ান, তাঁরা ইংরেজি বিষয়ের চেয়ে বেশি বেশি শিক্ষা দিতে পারেন। তাঁর ভাবনার সঙ্গে সবকিছু মিলে গেছে। তাঁর ছাত্ররা আজ সরকারের বড় বড় পদে চাকরি করে। তারা সময়ে-অসময়ে এসে দেখা করে যায়। কত কত উপহার আনে। নিশ্চয়ই তারা তাঁর কাছ থেকে একটু বেশি কিছু পেয়েছে। এটা ভেবে মন ভরে যায় তাঁর।
পঞ্চম শ্রেণীর ফার্স্ট বয়ের নাম ভিক্টর। সে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, হেডস্যার যদি স্কুলে শহীদ দিবস উদযাপন করতে রাজি না হন, তাহলে আমরা আন্দোলন করব। দরকার হলে মিছিল বের করব। তারপর আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব।’
মওলা মুহম্মদ স্যার অবাক চোখে ভিক্টরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন এ ছেলেটার ভেতরে আগুন আছে। সে প্রতিবাদ করতে পারে। আর এমন ছেলেরাই তো বড় হয়ে সর্বহারা মানুষের বন্ধু হয়।
ভিক্টরের কথা শুনে ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই বলল, হ্যাঁ স্যার, ভিক্টরের সঙ্গে আমরাও আছি।’
মওলা মুহম্মদ স্যার হাত ইশারায় সবাইকে থামিয়ে দিলেন। তিনি আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তার বুক ফেটে গেলেও মুখ ফুটছে না। মানুষ এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একটা শ্রেণি চায় মনের মধ্যে একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধরে রাখতে। গ্রামে মানুষ, স্কুলের কিছু শিক্ষক বলতে শুরু করেছে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া পাপ। স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়া আর পূজা করা একই ব্যাপার। এসব কথা তিনি মুখের ওপরে বলতে শুনেছেন। তখন কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করতে পারেননি। আর প্রতিবাদ করলেও রক্ষা নেই। রোষানলে পড়তে হয় কিছু মানুষের। একঘরে করে করে ওরা।
ভিক্টর দারুণ মর্মাহত হলো মওলা মুহম্মদ স্যারের ফ্যাকাশে মুখ দেখে। সে স্যারকে খুবি শ্রদ্ধা করে। স্যার তাঁর মাথায় হাত রেখে সেদিন ওর বাবার সামনে বলে ছিলেন, ‘জয়নুল আবেদীন ভাই, তোমার ছেলে একদিন অনেক দূর যাবে। সে হবে একজন মহাপুরুষ।’
ভিক্টর তখন বাবার মুখের দিকে একবার তাকিয়েছিল। আনন্দে নাকি দুঃখে বাবার দুই চোখ জলে ছলছল করে উঠেছিল। কেন সেদিন বাবার দু চোখ জলে ভিজে গিয়েছিল সেটা বোঝার বয়স তখনো তার হয়নি।
জয়নুল আবেদীন পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে কিছু খুচরা পয়সা ছেলের হাতে দিয়েছিলেন।
ভিক্টর সেদিন দারুণ আনন্দিত হয়েছিল।
ভোলা পিঠের ওপর একটু ধাক্কা দিতেই ভাবনাটা মুহূর্তেই মধ্যে উবে গেল।
মওলা মুহম্মদ স্যার চপ্পল পায়ে পরে হাঁটতে থাকলেন অফিসরুমের দিকে।
ক্লাসরুমে এবার হট্টগোল শুরু হলো।
সবার মুখে একই কথা আগামী পরশু অবশ্যই শহীদ দিবস পালন করব আমরা। হেডস্যার রাজি হলে হবে, না হলে নাই। ক্লাসের সবচেয়ে সাহসী মেয়ে রওশনারা। সে একটু রেগেমেগে বলল ‘এই ভিক্টর, তুই মেয়েদের মতো করে অমন নাকি নাকি সুরে কথা বলবি না তো। তুই হলি আমাদের ক্লাসের মধ্যে ফার্স্টবয় এবং ক্যাপ্টেনও। তোর তো অনেক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কেন তুই চুপ থাকবি?’
রওশনারার কথা শেষ হতেই আশানুর এগিয়ে এলো। ও একটু কথা কম বলে। আবার যখন বলে তখন আর থামতে চায় না। ও হলো এ গ্রামের হাশিম ডাক্তারের মেয়ে। বাবা ডাক্তার এ কারণে ওকে সবাই একটু আলাদাভাবে দেখে। সে বলল, ‘হ্যাঁ ভিক্টর। দরকার হলে আমরা স্কুল ছুটির পর শহীদ মিনারটা সাফসুফ করব। আশপাশের ঝোপ-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করব। কী বলিস তুই?’
সব ছাত্রছাত্রীর জোড়া জোড়া চোখ এখন আশানুরের দিকে। সবাই আশানুরের কথায় সমর্থন দিল।
ভিক্টর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে হেডস্যারের অফিসরুমের সামনে জড়ো হলো। ভিক্টরের মুখে দাবি দাওয়ার কথা শুনে হেডস্যার তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বেত হাতে তেড়ে এলেন ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে। গজরাচ্ছেন তিনি ‘হারামজাদা, উল্লুক, বাঁদর সব। পড়াশোনা রেখে শহীদ দিবস পালন করবে? মেরে হাড়গোড় ছাতু বানিয়ে ফেলব একেবারে। এক মিনিটের ভেতরে ক্লাসে গিয়ে পড়া শুরু করবি। এক্ষুনি বারেক মোল্লা স্যারকে অঙ্ক ক্লাস নেয়ার জন্য পাঠাব দাঁড়া।’
বারেক মোল্লা স্যারের নামটা উচ্চারণ করলে ছাত্রছাত্রীদের গায়ে একশো দুই ডিগ্রী জ্বর ওঠে।
ভিক্টর দেখল তার পেছনে যারা ছিল, তারা একে একে সটকে পড়েছে। সবার আগে পালিয়েছে ভোলা। মনটা বেজার করে ধীরে পায়ে ক্লাসে ফিরে এলো ভিক্টর। তাহলে কি আগামী পরশু ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া হবে না?
ঢং ঢং ঢং।
ছুটির ঘণ্টা পড়ল। চারদিকে ছাত্রছাত্রীদের চেঁচামেচি, ধাক্কা-ধাক্কি। কে কার আগে ক্লাস থেক বের হবে এ নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। ভিক্টর তার ক্লাসের সব ছাত্র-ছাত্রীকে বলে দিল বিকেলে ওদের বাড়ির ওপাশে হঠাৎপাড়ার বটতলায় জড়ো হতে। মাহফুজা, মজিদ, রওশনারা এবং আশানুর ভেতরে ভেতরে দারুণ কৌতূহলী হলো। ওরা বুঝলো যে ভিক্টর নিশ্চয়ই কিছু একটা করবে। ওর খুব জীদ। ভাঙবে তবুও মচকাবে না।
সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ভিক্টরের মুখপানে। তারপর যে যার বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
ভিক্টরের খুব মন খারাপ।
উন্তি বিবি পুঁটি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে দিলেন।
মাছের কাঁটা বাছছেন উন্তি বিবি।
তেতে ওঠে ভিক্টরÑ ‘ওহ! দাও তো মা। অত কাঁটা বাছাবাছির দরকার নেই। পুঁটি মাছ কাঁটাসমেত আমি খেতে পারি।’
উন্তি বিবি ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। বলেন, ‘তোর এত তাড়া কিসের শুনি, বাপু? একটু ধীরে-সুস্থে খা বাবা। পেট ভরে ভাত না খেলে এত এত পড়া মনে রাখবি কী করে?’
মার কথা শুনে একটুও থামে না ভিক্টর। মুঠো মুঠো ভাত মুখে দেয়।
‘ও খোকন, আমার সোনাজাদু মানিক, একটু ধীরে ধীরে খা না।’ মিনতির গলায় বলেন উন্তি বিবি। ‘ওফ! অত বিরক্ত করো না তো মা। আমার দরকারি কাজ আছে আজ। যেতে হবে এক্ষুনি।’
‘তুই এখন ছোট। তোর আর কী এমন দরকারি কাজ শুনি?’
‘দেখ মা, আমাকে এখন আর খোকন-টোকন, বাবু সোনা, সোনাজাদু এসব বলে ডাকবে না তো। আমি এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। অনেক বড় হয়েছি।’
পানিও মুখে দিল না ভিক্টর। উঠে দাঁড়াল।
উন্তি বিবি শাড়ির আঁচলখানা ভিক্টরের মুখের সামনে ধরে বললেন, ‘আয় সোনা, মুখটা মুছিয়ে দিই।’
‘এই তো তোমার দোষ। আবার পেছন থেকে ডাক দিলে?’
চোখের পলকের মধ্যে উন্তি বিবির সামনে থেকে পালাল ভিক্টর।
ছেলের চলে যাওয়া পথপানে উদাস চোখে তাকিয়ে রইলেন উন্তি বিবি। আট আটজন সন্তানের পর কোলজুড়ে এসেছিল ভিক্টর। কী যে খুশির দিন হয়ে উঠেছিল সেদিন। সারাক্ষণ ওকে নিয়ে হাসি আনন্দে ভরে থাকত বাড়িটা। সেসব স্মৃতি মনে পড়লে খুশিতে মন ভরে যায় তাঁর। তখন কি আর সংসারে এত টানাটানি ছিল তাঁর? গোয়ালঘরে জোড়া জোড়া চাষের বলদ। বারোমাস একটা না একটা দুধালো গাভী থাকতোই। এঁড়ে আর বকনা বাছুরগুলো সারাদিন উঠোনে লাফিয়ে বেড়াত। গাভীর দুধ দুয়াতেন তিনি বেলা বাড়লে। তাঁদের বড়পুকুরে রুই, কাতলা, মৃগেল মাছের লাফালাফি থাকত বারো মাস। আর পুঁটি, টেংরা, চিংড়ি মাছ তো বছর শেষেও ফুরাতো না। ধানী জমিতে শুরু হতো ধান কাটা। দুটো-তিনটে গোলা ভরে উঠত ধানে। যখন গোলায় আর ধান ধরতো না, তখন ভাঁড়ার ঘরে মাটির কুটিতে ভরে রাখতেন সেই ধান।… কত কথা মনে পড়ে উন্তি বিবির। পুরনো স্মৃতি হৃদয়ের মাঝারে গেঁথে থাকে। আর আজ কী হাল হয়ে গেছে তাঁর সংসারের। দুটো মেয়ে বড় হয়ে উঠছে। বিয়ে দিতে হবে তাদের। মানুষ বিয়ে নিয়ে নানা কথা বলে। মানুষের নানারকম সমালোচনা শুনে নীরবে কাঁদেন তিনি। বুকের ভেতরটা গুঁমরে গুঁমরে কেঁদে ওঠে। এখন তিনি বেশি বেশি ভিক্টরের কথা ভাবেন। স্কুলের শিক্ষকরা বলেছেন ছেলের মাথা খুব ভালো। বড় হয়ে নাম করবে।
এখন বিকেল ছুঁই ছুঁই।
রাখালেরা গরু চরিয়ে ঘরে ফিরছে। রাস্তায় পাল পাল গরু। কৃষকরা ক্ষেতের টাটকা শাকসবজি ভরা ঝুঁড়ি মাথায় নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটছে।
ভিক্টর এসব দৃশ্য দেখে আর পায়ে পায়ে এগোয় হঠাৎপাড়ার দিকে।
ফেব্রুয়ারি মাস বিদায় নেব নেব ভাব। শীতও জেঁকে বসেছে শেষ বেলায়। উত্তরের হাওয়া আরো হিম হয়ে আসছে।
চারদিকে বাঘকাঁদা শীত।
ভিক্টর আজ তার বেশ কয়েকজন সহপাঠীকে আসতে বলেছিল হঠাৎপাড়ার বটতলায়।
একুশে ফেব্রুয়ারির আর মাত্র একদিন বাকি। শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান পালিত হবে কি হবে না তার নামগন্ধও নেই হেডস্যারের ভেতরে। যখন মাইকেল রোজারিও স্যার এই স্কুলে ছিলেন, তখন প্রতিবছর শহীদ দিবস পালিত হতো। তিনি অন্য স্কুলে বদলি হয়ে যাওয়াতে স্কুলের পরিবেশটা রাতারাতি পাল্টে গেল। সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। ভিক্টর একদিন রিফাতকে বলেছিল ‘তার এ স্কুলে আর ভালো লাগে না। কোনো আনন্দ নেই এখানে।’
ভিক্টরের কথা শুনে রিফাত সেদিন বলেছিল, ‘আর তো ক’টা মাস। তারপর চলে যাব হাইস্কুলে। এই মরার স্কুলের মুখে লাত্থি মারি শালা।’
ভিক্টর স্বার্থপর ছেলে নয়। নিজের ভালোর চেয়ে অন্যের ভালোর কথা বেশি ভাবে সে। ও মায়ের কাছে শিখেছে, “অন্যের ভালো করলে সব সময় নিজের ভালো হয়।” বাবার কাছ থেকে শিখেছে, “মানুষ মানুষের জন্য।” মা-বাবার এসব উপদেশ সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। তার স্বপ্ন সে একদিন সকল মানুষের হবে।
শরীরে ঠাণ্ডা বাতাস লাগতেই দারুণ সুখ অনুভব করে ভিক্টর। ও আরো জোরে হাঁটে।
এক দৌড়ে পৌঁছে যায় দাউদদের বাবলা গাছ তলায়। গাছে অনেক পাখি আশ্রায় নিয়েছে। দিন পেরিয়ে মা পাখিরা হয়তো নীড়ে ফিরেছে। ছানাগুলো মাকে পেয়ে খুশিতে আটখানা। দারুণ হৈ চৈ হচ্ছে পাখিদের মধ্যে।
বাবলা গাছের ডালে ডালে পাখিদের কলরব, সেটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে ভিক্টর। এসব দৃশ্য দেখলে আর অন্য কোথাও যেতে মন চায় না ওর।
ভিক্টরের খুব ভালো লাগছে মা পাখি ও ছানাগুলোর সোহাগ দেখতে।
ক্লাসের সব বন্ধুই ওকে বলে, ‘সত্যি ভিক্টর, তুই অন্যদেরও থেকে আলাদা। তুই আকাশ নিয়ে ভাবিস, পুকুরের মাছেদের খেলা দেখিস, এখানে-ওখানে ফুটে থাকা ফুলগুলোকে স্পর্শ করিস, দুঃখী মানুষের দুঃখ দেখে কাঁদিস, কই এসব ব্যাপার তো আমাদের মাথায় ঢোকে না। এই কারণে তুই গ্রেট, বন্ধু।’
বন্ধুদের এসব কথা ওর মনে পুলক জাগায়। শুনতে বেশ ভালোই লাগে। ও বন্ধুদের এসব কথা শুনে আরো মুগ্ধ হয়। অনুপ্রাণিত হয়।
ভিক্টর আরো দ্রুত পায়ে হাঁটে। ওর খুব অনুশোচনা হয়, বন্ধুরা হয়তো আগে আগে এসে ওর জন্য অপক্ষা করছে।
ভিক্টর লালু চাচার ঘরের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে। ওই তো ইস্রাফিল যাচ্ছে। হাত উঁচুয়ে ডাকে, ‘এই ইস্রাফিল, একটুু দাঁড়া না।
ইস্রাফিল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ক্লাসের ক্যাপ্টেন ডাকলে কি না থেমে পারা যায়? তার ওপর ভিক্টর শুধু ক্যাপ্টেন বলেই কথা নয়, ওকে সত্যিকারে একজন ভালো ছেলেও বলা যায়। ও প্রতিদিন কারো না কারো উপকার করেই। ওর নিজের ভালোটা আগে দেখে না কখনো। ওর কাছে অন্যের ভালোটা আগে।
ইস্রাফিল বলে, আয় ভিক্টর।
হঠাৎপাড়ার ছেলেমেয়েরা বড় মাঠটিতে খেলায় মশগুল।
ধীরে ধীরে বটতলায় এসে পৌঁছায় ভিক্টর ও ইস্রাফিল।
একেবারে ফাটাফাটি ব্যাপার-স্যাপার। শুধু মাহফুজা, মজিদ, রওশনারা, আশানুর মনি বিশ্বাস, মুজিব বিশ্বাস নয়, আরো কত ছেলেমেয়ে বটতলায় এসে হাজির হয়েছে।
মাঠ থেকে কৃষক-কৃষাণরা ফিরছেন। তাদের চোখে-মুখে নানা কৌতূহল এক জায় এত ছেলেমেয়েকে জড়ো হতে দেখে। প্রথমে মাহফুজা বলে উঠলো, ‘শোন ভিক্টর, তোর মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম।’
ভিক্টর বোকার মতো চেয়ে থাকে মাহফুজার দিকে। ‘আবার হেবলাকান্তর মতো তাকিয়ে আছিস?’ উতেজিত গলায় বলল মাহফুজা।
মুখ কাঁচুমাচু করে ভিক্টর বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। এখনি আলোচনা শুরু করব।’
মাহফুজা গলার স্বর নিচু করে বলল, ‘তোরা তো ছেলে। তোদের জন্য সাত খুন মাফ। আমরা হলাম মেয়ে। পান থেকে চুন খসলেই হয়েছে, কত প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বাড়ি ফিরে। সেটা একটু ভাবতে পারিস না?’
মাহফুজার কথা শুনে অন্য মেয়েরাও সমর্থন দিল তাকে।
ভিক্টর সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ‘পরশু দিন হলো বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জনের দিন। পাকিস্তানি শাসকরা চেয়েছিল বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেবে। তারপর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শিক্ষক, জনতা ও ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকার রাজপথে মিলিত হয়েছিল। তারা শ্লোগানে শ্লোগানে কাঁপিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকের মসনদ। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই।’ ঢাকার রাজপথে এসব শ্লোগান চলে ছিল দিনভর।
তারপর পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের পোষা পুলিশ গুলি চালালো এদেশের দামাল ছেলেদের বুকে। মা মা বলে ঢাকার আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করেছিল দামাল ছেলেরা। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ঢাকার পিচঢালা পথ। শহীদদের বুকের তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল রাজপথে। শহীদদের মুখে তখন অমর বাণী ‘মোদের গরব; মোদের আশা আ’ মরি বাংলা ভাষা’।’ ভিক্টর যেন আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। বটতলায় সহপাঠীদের সামনে বক্তৃতা করছে সে। একেবারে গলা ছেড়ে। এতে তাকে ছাত্রনেতা ছাত্রনেতা মনে হচ্ছে।
মজিদ বেশি কথা বলে না। সবসময় গুনগুন করে গান গায়। ওর মুখে যেন বোল ফুটেছে। বলল, ভিক্টর আর তো মাত্র একদিন আছে শহীদ দিবসের। কিন্তু…!’
‘হ্যাঁ মজিদ, হেডস্যার শহীদ দিবস পালন করতে চান না। তবে স্বাধীনতা ও শহীদ দিবস পালনের জন্য অর্থ বরাদ্ধ থাকে স্কুলের নামে। সেসব টাকা তিনি কী করেন?’
মনি বিশ্বাস বলল, ‘নিশ্চয়ই তিনি টাকাগুলো আত্মসাত করেন।’
মজিদ একটু রেগে রেগে বলল, ‘আমরাও হেডস্যারকে দেখিয়ে দিতে চায়। আগামীকাল আমরা শহীদ মিনারটা সাফসুফ করব। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা নেব। যে যা পারবে সে মতো চাঁদা দেবে। আর সেটা পয়সা বা টাকা হলেও চলবে। তোরা কি বলিস?’
ভিক্টর বলল, ‘আমাদের ভাইয়েরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন ও বোনেরা ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। তবুও তাঁরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার কোনা হানি হতে দেননি। তাই আমরা কিছু কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করে কি ফুল কিনতে পারব না? আমরা কি ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারব না?’
সবাই ঘিরে ধরল ভিক্টরকে। পকেটে এক টাকা দুই টাকা যার কাছে যা ছিল, একে একে ভিক্টরের হাতে তুলে দিল সবাই।
ভিক্টর অবাক চোখে তাকিয়ে আছে
হাতের মুঠোতে রাখা খুচরা পয়সা ও টাকা দেখে। ওর মনে পড়ছে বাবার শেখানো সেই বিখ্যাত কথাটি, “আলো জ্বালাবার লোক থাকলে আলো জ্বলবেই।”
ভাষা শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান হবে শুনে সবাই কিছু কিছু করে টাকা ওর হাতে তুলে দিল। ওরা শুধু এটুকুই জানে যে, উনিশশো বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষার সম্মান রাখার জন্য অনেকে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। কেউ কেউ জেলও খেটে ছিলেন। আর এই ভাষা আন্দোলনে সেদিন স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও অংশ নিয়েছিল।
আজ যেমন অংশ নিয়েছে ওর সহপাঠী মাহফুজা, আশানুর, আলেয়া, রওশনারা।’
‘কী ভাবছিস অমন হা করে?’ ভিক্টরকে প্রশ্ন করে রওশনারা।
‘ভাবছি, এতগুলো টাকা চাঁদা উঠবে, আমি তো ভাবতেও পারিনি।’
‘থাক বাবা, হয়েছে। তোকে আর অত ভাবতে হবে না। আজ সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শো টাকা হয়েছে। তাই তো?’ রওশনারা বলে।
‘হ্যাঁ রে। আরো তো টাকা লাগবে।’
‘দুর ছাই, মুখ গোমড়া করিস না তো ভিক্টর। তোর মুখ গুমড়া আমার ভালো লাগে না। কাল আবারো স্কুলে টাকা উঠবে দেখিস।’ ভিক্টরের কাঁধে হাত রেখে সান্ত¦নার গলায় বলে আশানুর।
ভোলা দৌড়ে এলো। সে চাঁদুর দোকান থেকে চানাচুর কিনে এনেছে।
সবাই যারপরনাই খুশি ভোলার এমন বুদ্ধি দেখে।
সবাই আনন্দ করে চানাচুর খাচ্ছে।
হঠাৎ পশ্চিমপাড়ার মক্তবঘর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
আর দাঁড়ানোর সময় নেই এখানে। ভিক্টর সবাইকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বিদায় জানাল।
অফিসরুমের সামনেটা এখন ভুতুড়ে নীরবতা। অন্যদিন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখানে বসে খেলা করে। আজ এমন নীরব কেন জায়গাটা? প্রশ্ন খেলা করে ভিক্টরের মাথার ভেতরে।
পা টিপে টিপে ভিক্টর হেডস্যারের পাশ দিয়ে স্কুলে ঢুকল।
হেডস্যার এখন ৫ম শ্রেণির জানালার পাশে পাইচারী করছেন। গম্ভীর মুখে পা মেপে মেপে হাঁটছেন। তাঁর চোখ দুটো লাল। নিঃশ্বাস ভারি।
স্যারকে দেখে ভিক্টর আন্দাজ করার চেষ্টা করে রাগ ওঠা মানুষের চেহারা বোধহয় এমনই হয়। দ্রুত পায়ে হেঁটে ক্লাসে ঢুকে পড়ল ভিক্টর।
স্যার এখনো রাগি রাগি চেহারায় বারান্দায় হেঁটে চলেছেন।
প্রথম বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্টর। ওর পাশে মজিদ, মনি বিশ্বাস আর মুজিব বিশ্বাস। মনি বিশ্বাস আর মুজিব বিশ্বাস হলো বিশ্বাসবাড়ির ছেলে। ওরা সবকিছুতেই গা বাঁচিয়ে চলে। হাঙ্গামার মধ্যে ওরা নেই। স্যারদর একটু সমীহ করে। সর্ব কথায়, জ্বি স্যার, জ্বি স্যার ভাব দেখায়।
মওলা মুহম্মদ স্যারও কেন যেন বিশ্বাসবাড়ির ছেলেদের একটু বেশি বেশি আদর স্নেহ করেন। দেখে মেজাজ গরম হয়ে যায় ভিক্টরের। সে আন্দাজ করতে পারে বিশ্বাসরা গাঁয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড়লোক। অঢেল সম্পত্তি ওদের। স্যাররা এ কারণেই বিশ্বাসবাড়ির ছেলেমেয়েদের প্রতি একটু গদগদ ভাব দেখান।
গতকাল বিকালে বটতলায় আলোচনা সভা করার পর থেকে বিশ্বাসবাড়ির ছেলেমেয়েরা পাল্টে গেছে। ওরাও বলেছে, এ স্কুলের হেডমাস্টার মুকিত স্যারের বেলমাথা একদিন ফাটাবোই।
ওদের কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়েছিল বটতলায় উপস্থিত ছেলেমেয়েরা।
ভিক্টর খুব খুশি হয়েছিল মনি বিশ্বাস আর মুজিব বিশ্বাসের কথা শুনে।
মনি বিশ্বাস তো আবার মুক্তিযোদ্ধা জালালউদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে। আগে ওরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মহান শহীদ দিবস, ১৫ই আগস্টের শোক দিবস সম্পর্কে মাথা ঘামাত না। এখন ভিক্টরের মুখ থেকে এসব জাতীয় দিবসের গুরুত্বের কথা শুনে ওরাও তার কথার মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে।
মনি বিশ্বাসের চিন্তা-চেতনায় একটু নেতা নেতা ভাব আছে, এটা উপলব্ধি করে ভালো লাগে ভিক্টরের। সে চায় শিক্ষকদেরও মতিগতি বদলাক। মহান স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের চেতনার বিরোধিতা কোনো শিক্ষক করতে পারেন কিন্তু সেটা তাঁর নিজ্ব ব্যাপর। তাই বলে ছাত্র-ছাত্রীরা এটাই বিশ্বাসী হলে তাদের কেন বঞ্চিত করবেন?
ভিক্টর ফিসফিসে গলায় মনি বিশ্বাসকে বলল, ‘দেখেছিস মনি, হেডস্যার কিভাবে আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখছেন।’
মনি বিশ্বাস বলল, ‘দুর, হেডস্যারের কথা এখন রাখ তো ভিক্টর। স্কুলে বিশেষ দিনগুলো উদযাপনের জন্য সরকার থেকে টাকা-পয়সা আসে। আর এসব টাকা বেশিরভাগই শিক্ষকদের প্যাকেটে চলে যায়। এটা আর চলতে দেয়া যায় না।’
ভিক্টর বলল, ‘আমরা ছোট ক্লাসে পড়ি, তাই বলে হেডস্যার আমাদের কথা রাখবেন না? তিনি ভাবছেন আমরা কিছুই বুঝি না। দেখিস সব অন্যায়ের প্রতিবাদ এখন থেকে এ স্কুলে হবে।’
অন্যরা সবাই ভিক্টরের দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
ভিক্টর আড়চোখে হেডস্যারের দিকে তাকাল।
হেডস্যার গুটি গুটি পায়ে অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলেন।
হেডস্যার চলে যেতেই সবাই হট্টগোল করে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল।
ভিক্টর ওদের কাছে গেল। ও মনে মনে ঠিক করেই রেখেছে আজ ছাত্রছাত্রীদের একত্র করতে হবে। সবাইকে শহীদ দিবস কেন পালন করা হবে, সেটার গুরুত্ব বোঝাতে হবে।
মুশারফ বিশ্বাসের ফজলি আম গাছের নিচে অনেক ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়। সবাইকে উদ্দেশ করে ভিক্টর যেন ছোটখাটো একটা ভাষণ দিয়ে ফেলল, ‘যাঁরা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, তাঁদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারে আমরা আগামীকাল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাব। এ নিয়ে আমরা স্কুলে ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠান করব। এ অনুষ্ঠানে তোমরা ইচ্ছা করলে যে কেউ শহীদদের নিয়ে লেখা বক্তৃতা, দেশাত্মবোধক গান, কবিতা ও ছড়া পাঠ করতে পারবে।’
সবাই মুগ্ধ হয়ে ভিক্টরের কথা শুনল। অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদার কথা বলতেই এক টাকা, পাঁচ টাকা করে ভিক্টরের হাতে দিল।
সব মিলে প্রায় শ’ পাঁচেক টাকা চাঁদা উঠল।
ভিক্টর সব ছাত্রছাত্রীর চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেল। এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ কয়েক বছর ধরে শহীদ দিবস ও স্বাধীনতা দিবস পালন করতে দেখেনি। বহু দিন পর স্কুলে একটা অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে তাই দেখে তারা আজ খুবই আনন্দিত।
ঢং ঢং করে ক্লাস শুরুর ঘণ্টা পড়ল।
সব ছাত্রছাত্রী ক্লাসে ফিরছে। ওদের মনে এখন খুব আনন্দ।
টিফিনের পর ক্লাস হলো মাত্র দুটো। তারপর ছাত্রছাত্রীরা ছুটতে শুরু করল বাড়ির দিকে।
সবাইকে ভিক্টর বার বার করে বলে দিয়েছে খুব ভোরে স্কুল প্রাঙ্গণে এসে হাজির হতে।
স্কুল ছুটির পর ভিক্টর বন্ধুদের নিয়ে পিন্টুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
মওলা মুহম্মদ স্যার ছাতা বগলে করে হাঁটছেন। আর বেশি দিন চাকরি নেই স্যারের। অবসরে যাবেন। মাথাভর্তি সাদা চুল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তিনি যখন হাঁটেন, তখন তার পিঠ কুঁজো হয়ে আসে। তবুও তিনি হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসেন। আবার হেঁটেই বাড়ি ফেরেন। স্যারের একটা বাইসাইকেল ছিল। স্যার প্রতিদিন ভোলা আর মহিমকে পড়া না পাড়ার কারণে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। স্যারের ওপর এ কারণে ভোলা ও মহিম সবসময় ফ্যাপা। ওরা প্রতিদিনই স্যারের সাইকেলের হাওয়া ছেড়ে দেয়। ওদের জ্বালায় স্যার স্কুলে সাইকেল আনা বাদ দিয়েছেন।
‘আরে ভিক্টর যে! স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। বাড়ি না ফিরে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতেছিস?’ মওলা মুহম্মদ স্যার নিচু গলায় বললেন।
‘না স্যার মানে…।’ তোঁতলাতে থাকে ভিক্টর।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। সব জেনে গেছি। তোরা নিজেদের উদ্যোগে টাকা সংগ্রহ করে আগামীকাল মহান শহীদ পালন করবি, এই তো? ব্যাপারটা যতবার ভাবছি ততবারই খুব অবাক হচ্ছি। আমরাও ছাত্রজীবনে এমন সব উদ্যোগ নিতাম।’
ভিক্টর মওলা মুহম্মদ স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অন্য ছাত্ররাও স্যারকে ঘিরে ধরেছে।
ভিক্টর খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল মওলা মুহম্মদ স্যারের কথাঘুলো।
মওলা মুহম্মদ স্যার বললেন, ‘গ্রামে তখন টিউবওয়েল ছিল কম। মানে পুরো গ্রামে একটা কি দুটো। তাই মানুষ পুকুরের পানিই পান করত। তারপর কলেরায় মরতো শত শত মানুষ। তখন মানুষ এটাকে ওলাওঠা রোগ বলতো। মানুষ ধারণা করত ওলা বিবির পূজা না দেয়ার কারণে এসব রোগ আসত গ্রামে। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ত এসব রোগবালাই। প্রতিদিন কত কত মানুষ মারা যেত। আমরা মানুষের এসব পুরনো ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কারের প্রতিবাদ করতাম।
রাত-দিন পালা করে ওই পুকুর পাহারা দিতাম, যাতে মানুষ ওলাওঠা রোগীর ময়লা কাপড়চোপড় পুকুরে ধুতে না পারে। আবার কারো আগুনে ঘর পুড়ে গেলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাঁশ, দড়ি ও উলুখড় সংগ্রহ করতাম তারপর যার ঘর পুড়ে যেত তাকে সেগুলো দেয়া হতো। অনেক সময় আমরা নিজেরাও খাটাখাটুনি করে তাদের ঘর তুলে দিতাম।’
সবাই মনযোগ দিয়ে এতক্ষণ মওলা মুহম্মদ স্যারের কথাগুলো শুনল।
ভিক্টর এবার আসল কথা তুলল। বলল, ‘স্যার, আগে আমাদের মাথায় চিন্তা ছিল অনুষ্ঠান পরিচালনা করার খরচের ব্যাপার নিয়ে। এখন সেটা আর সমস্যা নয়। এখন আমাদের দরকার একজন অভিভাবকের।
মওলা মুহম্মদ স্যার হাসছেন। তিনি একটু গভীর হয়ে ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা। আমি না হয় সন্ধ্যার পর আসব তোদের বাড়িতে।’ আপনি আসবেন স্যার? কিন্তু এতটা পথ হেঁটে হেঁটে…।’
ভিক্টরের কথা শেষ হতে দিলেন না মওলা মুহম্মদ স্যার। তিনি বললেন, ‘আরে আজ তো আমি তোদের গ্রামেই থাকছি। আমার মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান কাল। নাতির হাতেখড়ি হবে। বাংলা বর্ণমালা প্রথমে আমার হাত ধরেই শেখানোর ইচ্ছে মেয়ের।’
‘বাহ! দারুণ তো। প্রতিটি বাঙালিই তো সন্তানের বাংলা বর্ণমালা লেখার দিনটিকে ‘হাতেখড়ি’র অনুষ্ঠান হিসেবে ঘরে ঘরে চালু করতে পারে।
‘কি রে ভিক্টর, আসব নাকি তোদের বাড়ি?’
স্যারের কথা শুনে ভিক্টরের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘আমাদের বাড়ি? কিন্তু…।’
‘হ্যাঁ, তোদের বাড়ির উঠানটা তো অনেক বড়। আমি দেখেছি তোর হাশিম চাচার কাছে ওষুধ আনার দিন। সন্ধ্যায় যদি ছাত্রছাত্রীরা আসে তো সবার বসার জায়গা হবে।’
স্যারের পরিকল্পনাটা খুব ভালো লাগল ভিক্টরের। ও স্যারকে কিছু একটা বলবে বলে আমতা আমতা করছিল।
মওলা মুহম্মদ স্যার বললেন, ‘ভিক্টর মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিস তুই?’
‘জ্বি স্যার। কিন্তু আমি তো সাহস পাচ্ছি না বলতে।’
‘ভয় পাবার কী আছে, বল কিছু বলার থাকলে।’
‘স্যার আমি বলছিলাম কী যদি হরিরামপুরে গিয়ে মাইক ভাড়া করে আনা হতো তাহলে অনুষ্ঠান দারুণ হতো।’
মওলা মুহম্মদ স্যার ও ছাত্রছাত্রীরা হা করে তাকিয়ে রইল ভিক্টরের দিকে।
ভোলা তো মাইক অনার জন্য দুই পায়ে খাড়া। ও বলল, ‘ইউনুস মাইকওয়ালা তো আমার বোনের দেবর। বোন বলে দিলে মাইক ভাড়াটাও হয়তো কম রাখতে পারে।’
ভোলার কথা শুনে ভিক্টরের দুই চোখ আনন্দে চিক চিক করে উঠল। ও হাসি হাসি মুখ করে ভোলার দিকে তাকাল।
মওলা মুহম্মদ স্যার খুক খুক করে কিছুক্ষণ কাশলেন। তাঁর হাঁপানির সমস্যাটা বাড়া শুরু করেছে ইদানীং।
এখন ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। শীত যাব যাব করেও যায়নি। ক’দিন ধরে শীতটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। দক্ষিণা বাতাস এসে লাগছে স্যারের বুকের ওপর। বয়স মানুষের সব শক্তি কেড়ে নেয়। একদিন তাকে বয়সের কাছে হার মানতেই হয়।
ভিক্টর বলল, ‘স্যার বিকেল হয়ে যাচ্ছে। আপনার শরীরের ওপর একটা চাদর দরকার। আর এই শীতের মাঝেও রাতের বেলা আপনি আমাদের বাড়িতে আসতে পারবেন তো স্যার?’
মওলা মুহম্মদ স্যারের ছানি পড়া চোখ। সেই চোখে ঝাপসা ঝাপসা দৃষ্টিশক্তি। স্যার চশমার কাঁচ দুটো মুছলেন পাঞ্জাবির খুঁটে। তাঁর গলা ধরে আসছে, ‘নারে, আমাকে যে আসতেই হবে। আমার মন বলছে, তুই একদিন অনেক বড় কিছু হবি। আর হবি খাঁটি দেশপ্রেমিক।’
মওলা মুহম্মদ স্যার আবার চশমাটা চোখে লাগালেন। গলার স্বর নিচু করে বললেন, এখন তবে যাই রে। তোরা গল্প কর।’
পায়ের চটিতে শব্দ তুল হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ গড়ার একজন কারিগর। যিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না শিক্ষার্থীদের, দেখান দু’চোখ ভরা স্বপ্ন। তিনি একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। ভাবতে ভাবতে জলে ভিজে আসছে ভিক্টরের দু’ চোখ।
আজকের সন্ধ্যাটা খুব ফুরফুরে। শীতকাল শেষ হয়ে শুরু হয়েছে ফাল্গুন। শীত শেষ হব হব করেও হচ্ছে না।
ভিক্টরদের উঠোনে ছাত্রছাত্রীদের জমজমাট মিলনমেলা বসেছে। অনেকে শরীরে গরম কাপড় পরে এসেছে। মাথায় উলের গরম টুপি। কারো কান ঢাকা মাফলারে।
মাইক টানানো হয়েছে ভিক্টরদের সজিনা গাছের ডালে।
হঠাৎ মাইকে বেজে উঠল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা বিখ্যাত গান, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।” এর পরেই বেজে উঠল সঙ্গীত শিল্পী আবদুল লতিফের রচনা ও সুর করা গান, “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়”। সব ছাত্র-ছাত্রীর গুন গুন করে মাইকের তালে তালে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইছে। এর পরেই শুরু হলো, “তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি”।
ভিক্টর ছোট ছোট কাগজগুলোতে লাল রং দিয়ে লিখতে শুরু করল, শহীদ দিবস অমর হোক। বড় বড় অক্ষরে লিখল, রফিকের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’,
‘বরকত আমার ভাই’, ‘সালামের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, এভাবে সকল শহীদকে নিয়ে ছোট ছোট কাগজের পোস্টারে শ্লোগান লিখল।
আজ মহান শহীদ দিবস। ভোরে মওলা মুহম্মদ স্যার এলেন। ছাত্রছাত্রীরা আবু দোকানদারের তেঁতুলতলায় জড়ো হয়েছে। সবার হাতে লেখা পোস্টার। সামনে ভোলা, মজিদ, মনি বিশ্বাস আর ভিক্টর ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে। রাস্তার দু’ধারে ছাত্রছাত্রীদের সারি সারি লাইন। সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন প্রভাতফেরি বের হবে তার জন্য।
ভ্যান গাড়িতে মাইক। বাজছে সেই বিখ্যাত সঙ্গীত, “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমি ভুলিতে পারি।”
মওলা মুহম্মদ স্যার সামনে। তাঁর পেছনে সব ছাত্রছাত্রী। প্রভাতফেরি চলছে।
ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের টিফিনের পয়সা দিয়ে শহীদ দিবস পালন করছে, খবরটা হেডস্যারের কানে পৌঁছে গেছে আগেভাগেই। তিনি হয়তো তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন। তিনি অন্য শিক্ষকদের নিয়ে ফুল হাতে শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে।
ভিক্টর ব্যানার হাতে শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়ানো এখন।
প্রধান শিক্ষক কাছে এসে খুবই স্নেহের গলায় বললেন, ‘কী রে দুষ্টু, দাঁড়িয়ে কেন, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করবি না?’
ভিক্টর পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে হেডস্যারের মুখ পানে।
আজ শোকের দিন। তবুও ভিক্টরের খুব খুশি খুশি লাগছে। সেটার কারণ হেডস্যার অন্য শিক্ষকদের নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসেছেন দেখে। তার কেন জানি দু’ চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে। সে গুমরে গুমরে কাঁদছে। তার হাতের ফুলগুলো তখন শহীদ মিনারের বেদিদে ছড়িয়ে পড়ছে।

