প্রগতিশীলতা কি? এই প্রশ্নের জবাব অনেক জ্ঞাণীগুণী মানুষ দিয়েছেন। আমি এই লেখায় প্রগতিশীলতা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা বলব।
আমার কাছে প্রগতিশীলতা মানে নিজের মতাদর্শের সাথে না মিললেও ভিন্নমত কে হেয় বা কটাক্ষ না করা। প্রগতি মানে এগিয়ে যাওয়া। একজন প্রগতিশীল মানুষ কখনো একটি চিন্তাধারা কে আঁকড়ে ধরে স্থির না থেকে সময়ের অগ্রগতির সাথে নিজেকে পরিবর্তন করে এগিয়ে যাবে। অন্য ধর্মের প্রতি অথবা জাতির প্রতি সম্মান, সহনশীলতা এটুকু প্রগতিশীল আচরণ তো প্রতিটি মানুষের কাছেই কাম্য। নিজের দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অন্য দেশের নিজ ধর্মাবলম্বীর থেকে আপন অথবা তালেবানের উন্নতিতে বাংলাদেশের মুসলমানের আনন্দ হাতির আকাশে উড়ে বেড়ানোর মতোই অযৌক্তিক এ ধরনের সাধারণ বোধ নিয়ে আমার এর আগেও একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ আছে। (আমার প্রবন্ধের সংকলন ‘টুকরো চিন্তার দেয়াল’ বইটিতে রয়েছে)। কিন্তু এছাড়াও প্রগতিশীল আচরণ আরও অনেক ক্ষেত্রেই কাম্য।
যেমন একজন ফ্রিল্যান্সিং অথবা ডিজিটাল মার্কেটিং করে প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে সাধুবাদ জানাতে হবে। মুখে বাঁকা হাসি তুলে ‘আরে কিসব কম্পিউটার টিপাটিপি করে টাকা কামায় এগুলো তো টিকবে না’ এ ধরনের মন্তব্য রক্ষণশীলতার চরম পর্যায় প্রকাশ করে। কিংবা ‘আরে তোমাদের বয়সে তো আমরা… ’ এই বাক্য দ্বারা শুরু হওয়া নব্বই ভাগ কথাই রক্ষণশীলতার ধারক।
ধর্মের বিধিনিষেধ দ্বারা মানুষকে বিচার করা বন্ধ করতে হবে। একজন মানুষকে আমি ততক্ষণ অব্দি খারাপ বলব না অথবা তার সমালোচনা করব না যতক্ষণ সে আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে কোনো অন্যায় না করে। একজন মানুষ কোনো ধর্ম না মানলে তাকে কটাক্ষ করা যাবে না। ধর্মীয় নিষেধ অমান্য করার কারণে আফটার লাইফে তাকে বারবিকিউ করা হবে সেটা সৃষ্টিকর্তা করবেন। কিন্তু তাকে এই কারণে কটাক্ষ করাটা গোঁড়ামি প্রকাশ করে।
তেমনি ভাবে ব্যক্তিজীবনে ধর্ম মানলে কাউকে উপহাস করাটাও ভীষণ নিন্দনীয়। একজন তার ধর্মের অনুকরণীয় পোশাক পরিধান করলে সেই পোশাক নিয়ে উপহাস নয় বরং তাকে সম্মান দিতে হবে।
একজন নারীকে লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার বানিয়ে ঘরবন্দি করা অথবা শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে বিয়ে, সংসার করতে বাধ্য করাটা রীতিমতো বর্বরতা।
আবার কোনো নারী যদি স্বেছায় নিজ আগ্রহে উচতর শিক্ষা গ্রহণ না করে সংসার করতে চায় তবে তার সিদ্ধান্তকেও সম্মান জানাতে হবে। এটাই প্রগতিশীলতা।
একজন মানুষ যে সারা দিন পাঠ্যপুস্তকে মুখ গুঁজে থেকে উচপদস্থ কর্মকর্তা হতে চায় তাকে আঁতেল আখ্যায়িত করে হাসাহাসি করা যাবে না, আবার যে পড়াশোনার মৌলিক চাহিদা পূরণের পরে বাকি সময়টা সৃজনশীলতার পেছনে খরচ করে এগিয়ে যেতে চায় তাকেও বাতিল বলে দেয়া যাবে না।
একটি মেয়ে ছেলেদের সাথে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ হলে সে পর্দা করেনি অথবা মাহরাম ছাড়া পুরুষের সংস্পর্শে এসেছে ইত্যাদি ব্যাখ্যা দিয়ে ভিকটিম ব্লেমিং করা যাবে না। ধর্ষকদেরই সম্পূর্ণ ভাবে দোষী এবং তাদের আইনানুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ ছেলেদের সাথে মেশা, বেড়াতে যাওয়া আইনে বৈধ। ধর্ষণটা দণ্ডনীয় অপরাধ।
একজন ছেলে বড় চুল রাখলে, মেয়েলি সাজে সজ্জিত হলে অথবা একটি মেয়ে সমাজে প্রচলিত পুরুষের পোশাক পরলে তাকে কটাক্ষ করা যাবে না। পোশাকের কোনো লিঙ্গ নেই।
একজন তারকা অথবা জনপ্রিয় ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনে কি করে তা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না। যেমন একজন খেলোয়াড় খারাপ খেললে তার খেলার সমালোচনা করতে হবে। কিন্তু সেই খেলোয়াড় কার সাথে প্রেম করে অথবা খেলোয়াড়ের বউ/প্রেমিকা/বোন পর্দানশীল না এ ধরনের অযাচিত, অশোভন মন্তব্য এবং চিন্তা দুটোই পরিহার করা আবশ্যক।
পাপ এবং অপরাধ দুটো এক বিষয় না এই ধারণা আপনার মস্তিষ্কে স্পষ্ট হতে হবে। পাপের জন্য পরকালে যা হওয়ার হবে। কিন্তু অপরাধ না করলে কাউকে হেয় করা যাবে না।
একজন ব্যাক্তির সফলতায় ঈর্ষার বসে তাকে ধর্ম অথবা সমাজের আদি নিয়ম না মানার অপরাধে অপরাধী ঘোষণা করে আত্মতুষ্টি লাভ রক্ষণশীলতার অন্যতম উচপর্যায় এবং এ ধরনের মানসিকতার মানুষের কারণে একটি জাতি পিছিয়ে থাকে।
আপনার মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে সফল ব্যক্তিকে হেয় করতে আপনার মতাদর্শ শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার চেষ্টা পরিহার করতে হবে। যেমন, একজন মডেল বা অভিনেতার বহুতল ভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আপনি বললেন এই বাড়ি-গাড়ি দিয়ে কি লাভ! দুদিনের এই দুনিয়া শেষে কবরে এরে তন্দুরি বানানো হবে তখন দেখবনি। এ ধরনের চিন্তাভাবনা একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। তার কবরে কি হবে আপনি দেখবেন না। তবে সে যে এখন সফল এটা আপনি দেখছেন। এটাকে মেনে নিয়ে তার মেধার প্রশংসা করাই প্রগতিশীলতা।
উপরোক্ত উদাহরণগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক বিষয় রয়েছে। সেসব বিষয়গুলোতে একজনের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তার ওপর নির্ভর করে তাকে প্রগতিশীল বলা যেতে পারে। প্রগতিশীলতা বাহ্যিক ভাবে নয়, প্রগতিশীলতা আসতে হবে চিন্তাধারায়।
প্রগতিশীল মানুষের আধিক্য কাম্য। প্রগতি আসুক।

