‘কি ভাবছো তখন থেকে?’
‘ভাবছি সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়। এই তো সেদিন আমাদের বিয়ে হলো, দেখতে দেখতে এক বছর পার হয়ে গেল। কাল তো আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। তোমার মনে আছে?’
‘কেন মনে থাকবে না। নিজের সর্বনাশের কথা কি কেউ ভুলতে পারে?’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ তাই!’
ফাহমান আর নাইসা। ছোট্ট সুখের সংসার। তারা দুজন দুজনকে পছন্দ করেই বিয়ে করেছে। ফাহমান একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। স্যালারিও বেশ ভালো। নাইসা ঘরদোর সামলাতেই বেশি পছন্দ করে। ভালোবাসা ঝগড়া খুনসুটিতে কখন যে বছর পার করে ফেলেছে তারা টেরও পায়নি।
‘কোথায় যাছো নাইসা?’
‘কোথায় আবার শপিংয়ে। কাল আমাদের এত স্পেশাল একটা দিন। একটু কেনাকাটা তো করতে হবে নাকি।’
‘হ্যাঁ, বুঝলাম। খুব তাড়াতাড়ি পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে দেখছি।’
‘সবকিছুতে বেশি বেশি। তোমার এই কিপটেমো স্বভাবটা আর গেল না।’
ফাহমান হেসে ফেলল। কিছু বলল না। নাইসার মুখ থেকে কিপটে শব্দটা তার বেশ লাগে।
নাইসাকে মার্কেটে নামিয়ে দিয়ে অফিস চলে গেল ফাহমান। শপিং করতে বরাবরই ভালো লাগে নাইসার। এটা ওটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সে। দুটো শাড়ি কিনল। কিছু মেকআপ আইটেম আর কিছু ওর্নামেন্টস কিনল। কেনাকাটা করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেল বলে দুপুরের খাবারটা কেএফসিতেই করে নিল নাইসা।
আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটা ট্যাক্সিতে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দিল সে। অনেক টায়ার্ড থাকার কারণে ট্যাক্সিতেই গা এলিয়ে দিল নাইসা। হুঁশ ফিরতেই হঠাৎ খেয়াল করল এটা তো বাড়ির রাস্তা নয়।
‘কোথায় নিয়ে যাছেন আমাকে? কি হলো? কথা বলছেন না কেন?’
ট্যাক্সি থামতেই নেমে গেল নাইসা। এত সুনসান নির্জন একটা এলাকা। দেখেই গা ছমছম করতে লাগল তার।
‘এটা কোন জায়গা? আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছেন?’
‘আপনি ঠিক জায়গায় এসেছেন।’
হ্যাট দিয়ে মুখ ঢাকা বলে চেহারাটা দেখতে পাছে না নাইসা।
‘কে’
‘আমাকে কি চেনা যায়?’ হ্যাটটা খুলে বলল সেই রহস্যময় ড্রাইভার।
‘অনিক, তুমি?’
‘যাক, চিনতে পেরেছো তাহলে।’
‘কেন চিনতে পারব না। আমরা এত ভালো বন্ধু ছিলাম।’
‘বন্ধু। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম ড্যাম ইট। এখনো বাসি।’
‘আমি তোমাকে কখনই সেই চোখে দেখিনি অনিক।’
‘আমি তো দেখেছি তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার। তোমার সাথে সংসার করার।’
‘এসব কি আজেবাজে কথা বলছো? আমি বিবাহিত। এসব কথা বলতে লজ্জা লাগছে না তোমার?’
‘আমি কেন লজ্জা পাব? ভালোবাসি আমি তোমাকে। ভালোবাসা কোনো পাপ নয়।’
‘আমাকে যেতে দাও অনিক।’
‘তোমার তো আর যাওয়া হবে না।’
‘মানে?’
‘চলো আমার সাথে।’
অনিক নাইসাকে টানতে টানতে একটা স্টোর রুমে নিয়ে আসলো।
‘অনিক কি করছো? ছাড়ো আমাকে।’
অনিক নাইসাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্টোর রুমে তালা দিয়ে দিল।
‘অনিক, দরজা খোলো। কি করছ তুমি?’
‘যা করছি বেশ করছি। আজ সারা রাত তুমি এখানেই থাকবে। ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। চাইলেও করতে পারব না। তোমাকে যে বড্ড বেশি ভালোবাসি। কিন্তু প্রতিশোধ আমি ঠিকই নেব। আজ সারা রাত এখানেই থাকবে তুমি। তুমি নিশ্চয়ই আমার কথা তোমার হাজব্যান্ডকে বলোনি। তোমার ফাহমান তোমার কথা মনে করে করে পাগল হয়ে যাবে। তোমাকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করবে। তার মনে সন্দেহ জাগবে যে সারারাত আমার বউটা কোথায় ছিল? কার সাথে ছিল। আর সেই সন্দেহ তোমাদের সম্পর্কে ধরাবে ফাটল। তোমার কোনো কথা সে বিশ্বাস করবে না। পুরুষ মানুষের মনে যদি একবার সন্দেহ ঢুকে যায় তবে সেই সন্দেহ থেকে কখনই বের হতে পারে না। তোমাদের সো কল ফেয়ারি টেল ভালোবাসার হয়ে যাবে সমাপ্তি। তুমি প্রতিনিয়ত দগ্ধ হবে। জ্বলবে-পুড়বে। আর আমি পাব শান্তি। পরম শান্তি।’
‘আমাকে যেতে দাও।’ কাঁদতে কাঁদতে বললো নাইসা।
‘সকাল হলেই পাবে তুমি মুক্তি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে। হা হা হা।’
দরজা খোলার চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল নাইসা। এমন অন্ধকার একটা জায়গা। একটা জানালা পর্যন্ত নেই।
কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল নাইসা। অনিক তার সাথে এটা কিভাবে করতে পারল। সে তো তার ভালো বন্ধু ছিল। তাহলে কেন এসব।
ফাহমান অফিস থেকে ফিরে নাইসাকে না দেখে বেশ অবাক হলো। ভাগ্য ভালো তার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি ছিল। না হলে তো ঘরেই ঢুকতে পারত না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো। কিন্তু নাইসার দেখা নেই। চিন্তিত ফাহমান নাইসার বাবা মাকে ফোন করল। তার পরিচিত কিছু বন্ধুবান্ধবকে কল করে দেখলা কিন্তু কেউ নাইসার কোনো খোঁজ দিতে পারল না। উপায় না দেখে তার এক পুলিশ বন্ধুকে ফোন করল ফাহমান।
‘তা সবই তো শুনলি আয়ান।’
‘তুই চিন্তা করিস না। আমি দেখছি বিষয়টা।’
এদিকে নাইসা নিস্তব্ধ অন্ধকারে নীরবে চোখের জল ফেলছে। কোথা থেকে কি হয়ে গেল? এক সর্বনাশা ঝড় সব তছনছ করে দিল।
সকাল হতেই স্টোর রুমের দরজা খুলে গেল।
‘যাও নাইসা যাও। নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়াও। নিজের সম্পর্কের ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে আমাকে কিন্তু মনে করো।’
অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে নাইসা। মনটা ভারী হয়ে আসছে। কি বলবে ফাহমানকে? সে কি তাকে বিশ্বাস করবে? নাকি অনিকের কথা সত্যি হবে।
হাঁটতে হাঁটতে বাসার কাছে পৌঁছে গেল নাইসা।
ফাহমান বাসার গেটে অস্থিরভাবে পায়চারী করছিল।
‘নাইসা।’
‘ফাহমান’
আর কিছু বলতে পারলো না নাইসা। জ্ঞান হারাল সে।
চোখ খুলে নাইসা দেখলো ফাহমান তার হাত ধরে বসে আছে।
‘তুমি ঠিক আছো তো।’
‘আমি ঠিক আছি।’
জুস নিয়ে আনছি। খেলে কিছুটা শক্তি পাবে।
‘ফাহমান আমি বলছি কি…’
‘আমি আসছি।’
ফাহমান নাইসাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে গেল। তার একরকম রূপ আগে কখনও দেখেনি নাইসা। ফাহমানের নির্লিপ্ত চাহনি তার মনে প্রশ্নের জোয়ার তুলছে।
‘এই নাও জুস।’
‘কিছু জিজ্ঞাসা করবে না।’
‘কি বিষয়ে’
‘কালকে যে আমি…’
‘কালকেরটা কালকেই চলে গেছে। পাস্ট ইজ পাস্ট। সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা ভুলে যাও।’
‘কিন্তু আমি বলব…’
‘আমি কিছু শুনব না। শুনতে চাইও না। যে কথা বলার সময় তোমার কষ্ট হবে তা আমি জানতে চাই না।’
ফাহমানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে নাইসা।
‘অনেক হয়েছে কান্নাকাটি। আজকে কি মনে আছে তো।’
‘হ্যাঁ আছে।’
‘হ্যাপি ম্যারেজ আ্যনিভার্সারি ফাহমান।’
‘সেম টু ইউ নাইসা।’
‘চলো রেডি হয়ে নাও। সারা দিন ঘুরব। রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করব। মুভি দেখব। ওকে।’
‘ঠিক আছে।’
নাইসা নীল রংয়ের শাড়ি পরল। হাতে নীল রংয়ের চুড়ি। কারণ ফাহমানের প্রিয় রং নীল।
হঠাৎ টেবিলে রাখা পেপারের একটি খবরে চোখ আটকে গেল নাইসার। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো তার।
‘দুবাইয়ের বিশিষ্ট বাংলাদেশি ব্যবসায়ী অনিক হাসানের মর্মান্তিক মৃত্যু’
গতকাল সকালে দুবাইয়ের বিশিষ্ট বাংলাদেশি ব্যবসায়ী অনিক হাসান মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন।
কি হলো চলো। ফাহমানের কথা শুনে ঘোর কাটে নাইসার।
‘কি পড়ছ।’
‘কিছু না।’
‘দেখি কি আছে পেপারে।’
খবরটায় চোখ বুলিয়ে নিল ফাহমান।
‘কে ইনি?’
‘হবে কেউ একজন।’
‘তুমি তাকে চেনো?’
‘না আমি চিনি না।’
‘চলো যাওয়া যাক।’
‘চলো।’
হঠাৎ এক দমকা হাওয়া নাইসাকে ছুঁয়ে দিল। আর টেবিলে রাখা পেপারটা পড়ে গেল মেঝেতে।

