চঞ্চল, হাসিখুশি, মায়ামাখা ও লাবণ্যময় মেয়ে রূপা। গরিব বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে। মেয়েটি দেখতে যেমন মায়াবী, তেমনি বুদ্ধিমতীও বটে। সেবার রূপা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। রূপার বাবা একজন রিকশাচালক। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণেও রূপাকে তার বাবা ভালো কোথাও ভর্তি করাতে পারেনি। পাশের গ্রামের একটা বালিকা বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করে দেয়।
দেখতে দেখতে কেটে যায় দুটি বছর। রূপা সপ্তম শ্রেণিতে ভালো রেজাল্ট করে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠে। রূপার বয়স যখন চৌদ্দ, তখন তার বয়ঃসন্ধিকাল। বয়ঃসন্ধিকালের জন্য পরিবর্তন আসে রূপার শরীরে। পরিবর্তন হতে থাকে তার চলাফেরায় ভাবভঙ্গিতেও আর দশজন বয়ঃসন্ধিকালের মেয়ের মতো সেও কারোর সাথে তেমন মেশে না, সব সময় একা থাকতে চায়।
রূপার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাকে না পারে সাইকেল কিনে দিতে কিংবা প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতের ভাড়া দিতে। তাই রূপাকে কষ্ট করে হেঁটেই প্রায় তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে স্কুলে যাতায়াত করতে হয়।
প্রতিদিনের ন্যায় রূপা একদিন একা হেঁটে হেঁটে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরছিলো, হঠাৎ দু’-তিনটে ছেলে তার পিছু নেয়, জোরে জোরে মুখে নানা রকম অশ্লীল শব্দ করতে থাকে,সেইসঙ্গে রূপাকে নানান ভাবে উত্যক্তও করতে পিছপা হয় না।
রূপা কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ বাসায় ফিরে আসে। ঘরে ফিরেই চুপচাপ তার বিছানায় শুয়ে পড়ে,এদিকে তার মা, মেয়ের এরকম কাণ্ড দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসে রূপার কাছে। জিজ্ঞেস করে, ‘রূপা! ও রূপা! কি হয়েছেরে মা তোর? আজ কেন জানি না স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই বিছানায় শুয়ে পড়লি?
তোর কিছু হয়েছে নাকি মা? তোর কি শরীর খারাপ করছে?
মায়ের এত প্রশ্ন শুনে রূপা একটা কথাই বলে দেয়, আমার কিছুই হয়নি মা, আমি এমনিই শুয়ে আছি।
এভাবে কেটে গেল বেশ কয়েকদিন, রূপার সাথে প্রতিনিয়তই ঘটছে বখাটে ছেলেদের এরকম উত্ত্যক্ত করার কাহিনী। রূপা এরকম সময় (বয়ঃসন্ধিকালের সময়) কারোর সাথে মেশে না। না পারে কারোর সাথে তার সমস্যার কথাগুলো শেয়ার করতে, না পারে বখাটে ছেলেদের কুরুচিপূর্ণ আচরণ সহ্য করতে।
পরিশেষে রূপা তার মাকে সব কিছু খুলে বলে।
এদিকে রূপার মা, মেয়ের এরকম কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে যায়, রূপার বাবাকে সবকিছু খুলে বলে। রূপার বাবা মেয়ের এরকম কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। তারা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয় রূপাকে বিয়ে দিয়ে দেবে। বন্ধ করে দেয় রূপার স্কুলে যাওয়া। এভাবে কেটে গেল ছয় দিন। রূপার কিছুই ভালো লাগে না, সে ঘরে বসে থাকতে চায় না, তার মধ্যে রয়েছে অদম্য প্রতিভা, রয়েছে একজন ডাক্তার হওয়ার তীব্র স্বপ্ন। কিন্তু তার সাথে ঘটে যাওয়া এরকম অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য তাকে থাকতে হছে বাড়িতে।
এভাবে চলতে চলতে একদিন পাশের গ্রাম থেকে এক ঘটক আসে রূপাদের বাড়িতে,রূপার বাবার সাথে কি যেন কথা বলে সেই ঘটক, যা রূপা ঘর থেকে শুনতে পায়।
আসলে ঘটক এসেছে রূপার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে, ছেলের বাবার অনেক জমি-জমা আছে, শুধু তাই নয়,রয়েছে পাকা বাড়ি। যেই কথা সেই কাজ। ঘটকের কথামতো ছেলে পক্ষ আসে রূপাকে দেখতে, রূপার রূপলাবণ্য দেখে তারা পছন্দ করে, যৌতুক ছাড়াই দেন বিয়ের প্রস্তাব। বিয়ের দিনও ঠিক করা হলো। রূপা বিয়ে করতে না চাইলেও তার বাবা- মা তাকে নানান ভাবে বুঝিয়ে বিয়ে দিয়ে দেন।
রূপা একটা বাচা মেয়ে বয়স মাত্র চৌদ্দ, আর ছেলেটার বয়স হবে প্রায় সাতাশ বছর। রূপা তার স্বপ্নকে দমিয়ে দিয়ে শুরু করে স্বামীর সাথে সংসার। দেখতে দেখতে কেটে গেল রূপার বৈবাহিক জীবনের একটি বছর। প্রথমত রূপার স্বামী তাকে আদর যত্ন করলেও পরে তার সাথে শুরু করে অন্যরকম ব্যবহার। তার কারণ, রূপার স্বামী মাদকাসক্ত ছিল। রূপা মা হতে চলেছে, চার মাসের গর্ভবতী হলো রূপা। রূপার শাশুড়ি তাকে দিয়েই সব কাজ করিয়ে নিত, একটুতেই বকাঝকা শুরু করেন।
রূপার স্বামীও তার সাথে বাজে ব্যবহার করতে থাকে, কথায় কথায় তার উপরে হাত তোলে।
শুরু হয় রূপার প্রতি শারীরিক নির্যাতন। রূপা একদিন এর প্রতিবাদ করলে,তার স্বামী তাকে খুব মারধর করে, রূপা অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে জ্ঞান ফিরলে আবার তাকে মারধর করে তার বাবার কাছে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। রূপা কিছুই বলতে পারে না, তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় আর দুই লাখ টাকা আনতে বলে।
রূপা বাড়িতে এসে তার বাবা-মাকে সব ঘটনা খুলে বলে, মেয়ের এরকম দুর্দশার কথা শুনে রূপার মা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। তারা রূপার স্বামীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও রূপার স্বামী স্পষ্ট করে বলে দেয় দুই লাখ টাকা সমেত মেয়েকে পাঠাবেন আর না হলে আর কোনোদিন পাঠাবেন না। ভেঙে পড়ে রূপার বাবা। টাকা জোগাড় করতে না পারায় রূপাকে তাদের বাসায় রেখে দেন। দিন গেল, মাস গেল এভাবে ঘনিয়ে এলো রূপার বাচা প্রসবের সময়।
৯ মাস যেতেই শুরু হয় রূপার প্রসব বেদনা। কষ্টে ছটফট শুরু করে রূপা। টানা দুদিন প্রসব বেদনায় রূপা ছটফট করলেও হাসপাতালে ভর্তি করার টাকা জোগাড় করতে না পেরে অবশেষে রূপার বাবা তার রিকশা বিক্রি করেন, সে টাকা দিয়ে রূপাকে হাসপাতালে ভর্তি করান।
মেডিকেলের ডাক্তাররা জানান, রোগীর অবস্থা ভালো নয়। তারা অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি রূপাকে। গর্ভকালীন সময়ে রূপার ওপর অমানবিক নির্যাতন, অগাধ শারীরিক পরিশ্রম ও বয়স কম হওয়ার কারণে রূপা বাচা প্রসবের সময় মারা যায়। তার গর্ভ থেকে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান। রূপার বাবা-মায়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তাদের একমাত্র মেয়েকে চিরতরে হারিয়ে তারা পাগলপ্রায়। কিন্তু রূপার রেখে যাওযা চাঁদের মতো ফুটফুটে বাচাকে বুকে আগলে ধরে চোখের জল মোছে রূপার বাবা -মা। তারা রূপার বাচার নান রাখেন ‘ঈপ্সিতা’।
আমাদের সমাজে আজকাল, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, যৌতুক,পণপ্রথা, নারী নির্যাতন ও অকাল মৃত্যু অহরহ ঘটেছে। তাই সমাজের সকলের নিকট লেখকের আকুল নিবেদন, সমাজ, রাষ্ট্র তথা পুরো দেশ থেকে যেন এই ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পণপ্রথা, নারী নির্যাতন ও অকাল মৃত্যু অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়, সেই লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করতে হবে।

