মাধবী, কেমন আছো জানতে চাইব না। আশা করি, আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালোই আছো। অবশ্য, ভালোই থাকার কথা তোমার! এখন বসন্ত। আমাদের প্রথম দেখাও হয়েছিল কিন্তু এমনই এক বসন্তে। তোমার ওই দুটি চোখের পানে কীভাবে যে তাকিয়েছিলাম সেদিন! প্রথম দেখা আর চোখের পলকেই প্রেম। আহা, কী মধুময় ছিল সেই ক্ষণ! তারপর জীবনের অনেক বসন্তই পেরিয়ে গেল কিন্তু সেই প্রথম অনুভূতি আর কখনোই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি।
এখনো প্রতিদিন তোমার হাতের সেই এক কাপ চা-এর স্বাদ ভুলতে পারিনি। প্রতিদিন সকালে তোমার হাতের সেই এক কাপ চা না হলে যেন সকালই হতো না!
মাধবী, তোমার মনে আছে সেই ঝুমকোলতার কথা? নিজের হাতে বুনেছিলে তুমি। বেশ বেড়েছিল বটে। প্রতিদিন বিকালে প্রকৃতির সাথে ঝগড়া করতাম, যে বাড়ির বাগানের মাধবীলতা বেশি সুন্দর নাকি আমার মাধবী বেশি সুন্দর! আর তুমি শুধু হাসতে একমনে। ভালোই ছিল কিন্তু সেই সময়টা।
তবে মাধবী, এখানের লোকেরাও খুব ভালো। তুমি থাকলে বেশ মজা হত বোধ হয়।সবার গল্পই প্রায় একরকম। এই দেখ, খোকার কথা বলতে ভুলেই গেলাম! তোমার সেই ছোট্ট খোকা আজ আর সেই ছোটটি নেইগো। সে এখন বিলাত ফেরত ‘বড়বাবু’। বউমাও বেশ দেখতে। আর নাতিটা যা হয়েছে না! মুখটা পুরো তোমার মতো! আর দুষ্টুমিতে হয়েছে খোকার মতোই।
আমার কথা আর কি বলবো তোমায়। মেয়ে নেইতো কি হয়েছে? বউমা সারাদিন মেয়ের মতোই শাসন করে আমায়। ওইতো সেদিন, খবরের কাগজটা খুঁজে পাছিলাম না, আর মেয়ে আমায় ‘অন্ধ’ বলেই শাসন করে দিল! কি আর করবো মাধবী, একটা চোখ না থাকলে তো মানুষ অন্ধই হয় বোধ হয়! সেদিন হঠাৎ মনে পড়লো খোকার ছোটবেলার কথা। ৪ বছরের ছেলেকে নিয়ে আমরা যে বান্দরবান গিয়েছিলাম, সে কথা মনে আছে তোমার? আজও শিউরে ওঠি সে কথা মনে হলে! একটা দুর্ঘটনায় খোকার বাম চোখটা নষ্ট হয়ে গেলে কোন কথা না বাড়িয়েই ডাক্তার বাবুকে বলেছিলাম, ‘আমার চোখটা খোকাকে মানাবে বেশ!’ কিন্তু আজ বড় হয়ে আমার চোখ দিয়ে বোধ হয় খোকা আমাকেই ঝাপসা দেখছে!
আসলে বয়সটাও তো কম হল না এই বুড়োর! লাঠি ছাড়া হাঁটতেই পারি না। এইতো সেদিন, ভুলোমনে চলতে গিয়ে সিঁড়ির পাশের ফুলদানিটাই ভেঙে ফেললাম! দাম আর কতই বা হবে তার। কিন্তু আমার থেকে নিশ্চয়ই বেশি দামি ছিল সেটা! আর তারপরের দিন থেকেই আমি এখানে! তবে এখানে বেশ ভালোই আছি এখন। অনেক বন্ধুও জোগাড় করে ফেলেছি! আর মজার কথা, আশ্রমের সবার গল্পই প্রায় এক। সারাদিন গল্পগুজবেই কেটে যায় আমার। কিন্তু রাত হলেই মনে হয় তোমার কথা! ওইযে, ওই তারাটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি আমার মাধবীর কথা! কি আর বলব, মাধবী! তুমি চলে গেলে ভিনদেশে, খোকা গেল বিদেশে আর আমি এখানে। সবই নিয়তি।
তবে সংসারে আশা ছাড়া কে-ই বা টিকে। আমিও তাই প্রতিরাতেই অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমাই। কে জানে, হয়তো নতুন একটা ভোর দেখলেও দেখতে পারি! তুমি ভালো থেকো।
ইতি
তোমার বুড়ো
জানাজার সমাপ্তি অনেক আগেই হয়ে গেছে। বাবার চোখের জলের কিছু আঁকাবাঁকা আর ঝাপসা অক্ষরের দিকেই এতক্ষণ তাকিয়েছিল। যান্ত্রিকতার এই যুগে বিলেতে মানুষ হতে গিয়ে হয়তো ভুলবশত যন্ত্রই হয়ে ফিরেছিল সে! তাই হয়তো চোখের জল গড়িয়ে পড়তে পড়তেও শেষ পর্যন্ত আর ভূমির ক্রোড় পেল না। আবার কে জানে, বাবার বাম চোখটাই বোধ হয় সেটা হতে দিল না।
সবই নিয়তি…!

