বর্ষণ আজাদ। লম্বা একহারা গড়নের ফর্সা আলাভোলা চেহারার চশমা পরিহিত বর্ষণকে দেখলে যে কেউ তাকে এক বাক্যে গুড বয়ের সনদপত্র লিখে দিতে বাধ্য। ঢাকা ইউনিভার্সিটির এপ্লাইড ফিজিক্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র বর্ষণ পড়ালেখা আর ক্যারিয়ারের ব্যাপারে যতটা সিরিয়াস, প্রেম ভালোবাসার ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। এই কারণে অবশ্য বন্ধু মহলে তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাও কম হয় না।
এইতো সেদিন ইউনিভার্সিটি বন্ধ হবার আগের শেষ আড্ডায় বন্ধু শফিক ব্যপারটা নিয়ে ঠাট্টা করে বললো,
– দোস্ত, ফাইনাল ইয়ারে উইঠা গেলাম তবু তোর একটা বিল্লা হইলো না!
এই বিষয়টা উঠলেই বর্ষণ অস্বস্তিতে ভোগে। যদিও জানে শফিক কি বলতে চায় তবু সে বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
– কিসের বিল্লা হবেরে? ফাইনাল ইয়ার থেকেই ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হয়, সেটা নিয়েই ভাবছি আপাতত।
– সেইটা মানলাম। তবে আর তিন চার বছরের মধ্যেই তো সেই চিন্তাও খতম হইবো, তখন তো বিয়া করা লাগবো দোস্ত। তোর লালুভুলু চেহারা আর মারদাঙ্গা রেজাল্টের জন্য অনেক মাইয়াই তো আশেপাশে ঘুরঘুর করে। সেইখান থেকে একজনরে হিসাবে রাখলে ভাল হইতো না? তাইলে পরে ক্যারিয়ারের চিন্তার লাগামে ঢিল পরা মাত্র তুই আল্লাহু আকবার বইলা বিয়ার ফাঁসে ঝুইলা পড়তে পারতি। মোটামুটি, ধরো তক্তা মারো পেরেক টাইপ সুপার এন্ডিং হইতো আরকি!
– তোর মাথা! এই ধরো তক্তা মারো পেরেক কেস ফিট করতে গিয়ে কতগুলো যে ধরা খেলো দেখলাম তো। ভবিষ্যতের পেরেক এখন যে কখনো কখনো হুল হয়ে ফুটতে পারে, সেটা চোখে পড়েনা? পরে পড়াশোনা শিকেয় তুলে মজনু হয়ে পথে পথে ঘুরি নয়তো মেয়ে হাতছাড়া হবার ভয়ে গোপনে কোর্ট ম্যারেজ করে বাবা মায়ের নাক কাটাই।
এভাবেই প্রেম ভালোবাসার কথা উঠলে সন্তর্পণে নিজের গা বাঁচিয়ে চলে বর্ষণ।তবে বাবা মায়ের একমাত্র আদরের দুলাল হলে সাধারণত শহুরে বেশীরভাগ ছেলেপিলেগুলো যেরকম মানুষ থেকে ধীরে ধীরে ফার্মের মোরগ মুরগীতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, বর্ষণ সে পথে না গেলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাকে সেই কাতারে ফেলা যায়। শান্ত শিষ্ট আর কম বাক্য ব্যয়ে বিশ্বাসী বর্ষণ আসলে বেশ খানিকটা আত্মকেন্দ্রিক গোছের। তার পৃথিবী বলতে তার বাবা মা আর হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু মাত্র। তো যাই হোক, এই মুহূর্তে বর্ষণের মনটা খুবই খারাপ! কেননা একটু আগে বাড়ীতে ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে তার গায়ের উপর একটা পলিথিন এসে পড়েছে। সন্ধ্যার আধো আধো আলোয় মাটিতে পড়া প্যাকেট আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া লিচুর খোসাগুলো দেখে তার গা ঘিনঘিন করে ওঠে। সে আশেপাশে তাকিয়ে ঘটনার মূল হোতাকে খোঁজে। কিন্তু কাউকে দেখতে পায়না।
বর্ষণ আপনমনে বিড়বিড় করে বলে,
– ছিঃ, এভাবে কেউ ময়লা ছুঁড়ে ফেলে! এই এলাকার লোকজন ভদ্রতাও জানে না দেখছি।
মাত্র কিছুদিন হয় বর্ষণরা এই এলাকায় নতুন এসেছে। ইউনিভার্সিটি থেকে এতো দূরে বাসা নেবার ক্ষেত্রে বর্ষণ বাবা মায়ের বিপক্ষে ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যাংকের হইহট্টগোলের চাকরীর শেষে তার বাবা আজাদ রায়হান একটু শান্ত আর খোলামেলা পরিবেশে বসবাস করতে চাইছিলেন। আক্কাসের বাবা তার স্কুল জীবনের বন্ধু। তাই বন্ধুর ইচ্ছে শোনা মাত্র নিজের তিনতলা বাড়ীর একপাশে বন্ধুকে এসে থাকার অনুরোধ জানায়। অবসরের জীবনটা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে নিরিবিলিতে কাটাতে পারবেন বলে আজাদ সাহেবও সানন্দে প্রস্তাবটা লুফে নেন। বর্ষণ তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে, তার পক্ষে এতোখানি পথ পাড়ি দিয়ে রোজ ভার্সিটিতে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আজাদ সাহেব তার সিদ্ধান্তে অনড়। এমনিতেই ভার্সিটি আর বন্ধুদের ফেলে এতো দূরে এই বাড়ীতে আসার কারণে বর্ষণের মেজাজ খারাপ, তার উপর এমন অভদ্র আচরণে মেজাজের ব্যারোমিটারের কাঁটা নীচে রাখা তার পক্ষে কঠিন বৈকি!
বর্ষণ নিজের মেজাজ ঠিক করতে বাড়ীর ছাদে চলে আসে। সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাসে বসলে যদি মনটা একটু ভাল হয়! কিন্তু ছাদে উঠে একটা দৃশ্য দেখে সে রীতিমতো অবাক হয়। তাদের বাড়ীওয়ালার ছোট ছেলে আক্কাস, ছাদে বসে বেশ আয়েশ করে লিচু খাচ্ছে। তেল চুকচুকে ছোটখাটো হাতি সাইজের আক্কাসকে লিচু খেতে দেখে গোটা ব্যপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ইচ্ছে হয় নীচ থেকে খোসাগুলো তুলে এনে আক্কাসের মাথায় ঢেলে দেয়। আশ্চর্য্য! এতো বড় ছেলে, অথচ এতটুকু বিবেক বুদ্ধি নেই যে ময়লাগুলো ফেলার আগে একটু দেখে নেবে! তাছাড়া যেখানে সেখানে ময়লা ফেলানোটাই বা কোন দেশের ভদ্রতা?
বর্ষণ অনেক কষ্টে নিজের মেজাজের লাগাম টেনে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
– আক্কাস ভাই, আপনি লিচুর খোসা নীচে ফেলেছেন?
আক্কাস আসলে ছাদে এসেছিল লুকিয়ে একটু আরাম করে লিচু খাবে বলে। বড় পরিবারের ঝামেলা হচ্ছে, কোন খাবারই একা একা আরাম করে খাওয়া যায় না। কেউ না কেউ ভাগ বসাবেই বসাবে। তাই পঞ্চাশটা লিচুর গোছা হাতে নিয়ে চুপে চুপে ছাদে চলে এসেছিল একাই সাবাড় করবে বলে।বর্ষণের গুরু গম্ভীর কণ্ঠে আক্কাস রীতিমতো চমকে ওঠে।
– ওহ তুমি? ভাল আছো?
বর্ষণ বিরক্তি নিয়ে ভাবে, ছেলেটা গর্দভ নাকি? কি প্রশ্নের কি উত্তর দিচ্ছে!
– জ্বি ভাল আছি। আমার প্রশ্নের উত্তর তো পেলাম না ভাই। আপনি লিচুর খোসা নীচে ফেলেছেন মাত্র?
আক্কাসের লিচু খাওয়া শেষ, সে তার লিচুর খোসাগুলো গুছিয়ে প্যাকেটে ভরতে ভরতে হালকা গলায় বলে,
– পাগল পেয়েছো আমাকে? লিচুর খোসা নীচে ফেলি আর আম্মা এসে রেগেমেগে আমাকেই ছাদ থেকে ফেলে দিক।
আক্কাস তার কাজ গুছিয়ে এঁটো হাতটা বর্ষণের কাঁধে রেখে আন্তরিক কণ্ঠে বলে,
– একটা উপদেশ দেই…এই বাড়ীতে থাকতে হলে একটা ব্যাপার সবসময় মাথায় রাখবে, ময়লা অলওয়েজ বিনে ফেলবে নয়তো আম্মার রোষানলে পুড়তে হবে আগাগোড়া।
আক্কাস হাসি হাসি মুখ করে তার পুতুপুতু চোখের একটা টিপে দিয়ে কথাটা হালকা করে হেলেদুলে ছাদ থেকে চলে যায়। বর্ষণ ছাদে এসেছিল মেজাজ ঠান্ডা করতে, কিন্তু আক্কাসের মিথ্যাচার আর সস্তা রসিকতায় তার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে যায়। সে আপনমনে বিড়বিড় করে বলে,
– এই এলাকায় আসাটাই ভুল হয়েছে আমার, ভার্সিটি খুললে আমি অবশ্যই হোস্টেলে চলে যাবো। বাবা এসব অদ্ভূত অদ্ভূত লোকজন কোথা থেকে যে যোগাড় করে, আল্লাহ জানে!
***
পরদিন খুব সকাল সকাল বন্ধু শফিকের কলে ঘুম ভেঙ্গে যায় বর্ষণের।
কলটা রিসিভ করে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জানতে চায়,
– কিরে, এতো সকালে?
– কি করিস দোস্ত?
বর্ষণ বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
– হাডুডু খেলি! এতো সকালে কেউ কল করে? মাত্র তো সাতটা বাজে!
– আরে আর বলিস না! ভার্সিটি খোলা থাকলে খালি ঘুম পায়, আর বন্ধের সময় চক্ষু বন্ধ কইরা মটকা মাইরা পইড়া থাকি তবু ঘুম আসে না। তাই ভাবলাম তোর একটু খোঁজ খবর নেই।
বর্ষণ হাই তুলতে তুলতে বলে,
– সারারাত বান্ধবীদের সঙ্গে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করলে ঘুম আসবে কেমনে বল? তা কি জন্যে কল করেছিস সেটা বল, আমার খোঁজ খবর নিয়ে যে তোর কতটা মাথা ব্যথা সেটা আমার ভালই জানা আছে।
বর্ষণের কথায় শফিক দমে না গিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে বলে,
– না মানে, এলাকায় নতুন গেলি। তাই ভাবলাম এলাকার লোকজন পাড়া প্রতিবেশী সম্বন্ধে একটু আপডেট নেই। তোদের পাড়া প্রতিবেশী কেমন দোস্ত?
– সেটা তো এখনও বলতে পারছিনা, আশেপাশে লাগোয়া বাড়ি বলতে একটাই দোতলা বাড়ি। বাকীগুলো খেলার মাঠ পেরিয়ে। তা আমার পাড়া প্রতিবেশীদের আপডেট দিয়ে তুই কি করবি?
– না মানে, ধর যদি পাশের বিল্ডিংয়ে কোন সুন্দরী বাস করে আর তার বারান্দাটা তোর ঘরের বারান্দার ফেস টু ফেস থাকে, তাইলে আজ বিকালে একটু আড্ডা দিতে আসতাম আরকি! এতো দূরে তো শুধু তোরে দেখতে আইসা লাভ নাই, তাই …
– তাই এতো সকালে আমাকে কল করে ঘুম থেকে উঠালি! তোর কপাল ভাল যে মোবাইলে কলার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, নয়তো নির্ঘাৎ তোর মাথাটা আমি ফাটিয়ে ছাড়তাম। আল্লাহর কসম!
শফিক নিরাস কণ্ঠে বলে,
– তাইতো পারবি! আচ্ছা, সত্যি কইরা বল দেখি…তোর কোন ম্যানুফেকচারিং ডিফ্যাক্ট নাই তো?
– মানে?
শফিক মিনমিনে কণ্ঠে ব্যাখ্যা করে,
– এই মানে কোন পুরুষ ঘটিত সমস্যা কিংবা কোন পুরুষ জনিত সমস্যা?
রাগে বর্ষণের ইচ্ছে হয় শফিকের নাকে দুম করে একটা বিরাশি সিক্কার ঘুষি মারে।
সে প্রায় লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে উচ্চ কণ্ঠে শফিককে বলে,
– হাড়ে হারামজাদা, তোকে একবার খালি সামনে পেয়ে নেই আমি! আসলে মিথ্যা বলেছি, আমার বাসার মুখোমুখি বাসায় খুব সুন্দর একটা মেয়ে থাকে। সকালে উঠে বারান্দায় গেলেই তার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়। কিন্তু তুই খবরদার আমার বাড়ীতে আসবি না। আসলে তোর ঠ্যাং ভেঙ্গে সেইটা দিয়ে যদি তান্দুরি চিকেন না করেছি তো আমার নামও বর্ষণ না।
বর্ষণ শফিকের উপর রাগ করে কলটা কেটে দেয়। যদিও শফিককে সাজা দেবার জন্যই মিথ্যেটা বলা। কিন্তু সে জানেনা তার এই কল্পনার মিথ্যাচার অচিরেই সত্য হতে যাচ্ছে।
সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে বর্ষণ ফ্রেশ হয়ে এলাকাটা ঘুরে দেখতে বের হয়। আসা অব্দি ঘর গোছানোতে এতই ব্যস্ত ছিল যে বের হয়ে একটু ঘুরেও দেখা হয়নি। কাল বিকেলে একটু বেরিয়েছিল অবশ্য, কিন্তু ঘুরে দেখার আগেই ঝপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো। বর্ষণ মসজিদের সামনের পুকুর ঘাঁটটা দেখে থমকে দাঁড়ায়। কি সুন্দর টলটলে জল! শহরে এমন ঘাঁট বাঁধানো পুকুর আর এমন পরিষ্কার টলটলে পানি দেখাই যায় না। বর্ষণ ধীর পায়ে ঘাটের শেষ ধাপে এসে দাঁড়ায়। পরিষ্কার জলে তার প্রতিবিম্ব দেখা যায়। সেদিকে চেয়ে নিজের চশমাটা হাত দিয়ে ঠিক করে আপনমনে অল্প হাসে বর্ষণ। নিচু হয়ে শান্ত জলে হাত ডুবিয়ে নাড়াচাড়া দিয়ে এলোমেলো করে দেয় নিজের প্রতিবিম্বটাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঁকাবাঁকা প্রতিবিম্বটাকে আবারও আকারে ফিরতে দেখে মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মুখের পাশে আরো একটা মুখের উপস্থিতি দারুণভাবে চমকে দেয় তাকে। চমকে ফিরে তাকাতে গিয়ে পা ফসকায় বর্ষণ। নিজের পতন ঠেকাতে আতিপাতি করে খোঁজে আঁকড়ে ধরার মতো কিছু।
চলবে..

