Close Menu
সূর্যাক্ষরসূর্যাক্ষর
    সাম্প্রতিক লেখা

    অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে : সেলিনা হোসেন (সাক্ষাৎকার)

    আমার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা : দেবেশ চন্দ্র সান্যাল (স্মৃতিচারণ)

    অদম্য কিশোর : শিবুকান্তি দাশ

    ছদ্মবেশী : শারমিন প্রিয়া

    অধিকার : অমল বিশ্বাস

    খোকন সোনা : মুহাম্মদ নূর ইসলাম

    ভুলে যেতে : মো. আমজাদ হোসেন

    বাহাদুরি : বিজন বেপারী

    চিরচেনা নাট্যমন্দির রোড! : আজমির রহমান রিশাদ

    মুখ মুখোশের আড়ালে : মুহিতুল ইসলাম মুন্না

    Facebook X (Twitter) Instagram
    সূর্যাক্ষরসূর্যাক্ষর
    • প্রবন্ধ
    • উপন্যাস
    • গল্প
    • কবিতা ও ছড়া
    • সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ
    • বই
    • প্রিন্ট ভার্সন
    0 Shopping Cart
    সূর্যাক্ষরসূর্যাক্ষর
    0 Shopping Cart
    Home » কাঠগোলাপ : ফারহানা জেসমিন মনি

    কাঠগোলাপ : ফারহানা জেসমিন মনি

    0
    By সূর্যাক্ষর অ্যাডমিন on May 31, 2024 গল্প
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    আজ আমার বাসররাত। সারাঘর খুব সুন্দর করে কাঠগোলাপ দিয়ে সাজানো। আমি খাটের মাঝখানে বসে আছি। খাটটা অসম্ভব সুন্দর করে কাঠগোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে। এমনকি আমার সব গহনাগুলোও কাঠগোলাপ দিয়ে বানানো হয়েছে। ঘরের মধ্যে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ মৌ মৌ করছে। এই ঘ্রাণই আমাকে বারবার সুদূর অতীতে নিয়ে যাছে।

    আমি মিলা। এইটুকুই আমার পরিচয়। আমি জানি না আমার বাবার নাম কি? মার নাম কি? কোথায় আমার বাড়ি? আমি কিছুই জানি না। তবে এক সময় সব ছিল এটা মনে করতে পারি। আর মনে করতে পারি আমার বড় বোনের নাম শিলা। আমরা পিঠাপিঠি দুবোন। আমার খেলার সাথী চায়না, ছুম্মা, মনি, শিলু ও আসাদ। গ্রামে আমাদের বাড়ি ছিল। বাড়ির সামনের দিকে নদী ছিল আর পিছনে অনেক ধানের খেত ছিল। বাড়িতে দাদা-দাদি, বাবা-মা, কাকা-কাকি আরও অনেক মানুষ ছিল। সারাদিন কেটে যেত খেলতে খেলতে। সবাই মিলে একসাথে নদীতে গোসল করা। মায়ের কোলে শুয়ে ঘুম পাড়ানি গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া, বাবা অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে বাড়ি ফেরা, বন্ধুদের সাথে লুকোচুরি খেলা এমন অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি আমার শুধু মনে আছে। যেগুলো আমার জীবনে মূল্যবান সুখ স্মৃতি, আমার অস্তিত্ব। অনেক যত্নে এই স্মৃতিগুলো আগলে আমি বেঁচে আছি।

    তখন আমার বয়স কতাহবে সম্ভবত পাঁচ-ছয়। এখনকার দিনের মতো ঘটা করে জন্মদিন পালন করা হতো না। বেশি হলে মা পায়েস রান্না করে মসজিদে মিলাদ দিতেন। সেজন্য কত বছর সঠিক বলতে পারব না, তবে তখনও স্কুলে যেতাম না এটা মনে আছে। একদিন বাড়িতে খুব আয়োজন। ভালো ভালো রান্না হছে, সবাই বাড়িঘর গোছগাছ করতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পরপর দাদার হাঁকডাক। এটা হলো না, ওটা হলো না। আমরা ছোটরা কিছু বুঝতে পারছি না। কি হলো বাড়িতে? তারপর শুনলাম কাকার বিয়ে। ঢাকা থেকে মেহমান আসবে তাই এত আয়োজন। কয়েকদিন পর শুনলাম আমাদের ঢাকায় যেতে হবে। সেখানেই বিয়ে নতুন কাকি আসবে। সে কি আনন্দ আমাদের। কাকা ঢাকায় চাকরি করতেন। বাড়িতে আসার সময় আমাদের জন্য কত কিছু নিয়ে আসতেন। কত গল্প করতেন ঢাকার রাস্তায় লাল নীল বাতি জ্বলে, অনেক বড় বড় গাড়ি, অনেক বড় বড় দালান, ঘরের মধ্যে বাথরুম, কল ঘোরালেই পানি পড়ে, রান্না করতে খড়ি লাগে না। আরো কতো গল্প শুনতাম। সেই ঢাকায় আমরা সবাই যাব। কি মজা! মা আমাদের দুবোনের জন্য কাপড় কিনে অনেক সুন্দর সুন্দর জামা বানিয়ে দিলেন। আমাদের আনন্দ আর ধরে না। প্রতিদিন কতবার যে মার কাছে জানতে চাইতাম আমরা কবে যাব, কবে বড় গাড়িতে চড়ব।

    অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা সকাল সকাল নদীতে গোসল করে নতুন জামা পড়ে ভাত খেয়ে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে। বড় গাড়ি দেখে যতটা না খুশি হয়েছিলাম কিন্তু গাড়ি চলার পর তারচেয়েও বেশি মাকে বিরক্ত করছিলাম। শরীর খারাপ লাগছিল। বারবার বমি হছিল। মা খুব আদর করে কোলের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। যখন ঘুম ভাঙল তখন দেখি চারপাশে শুধু পানি আর পানি। আমরা সবাই বড় একটা লঞ্চের মধ্যে। বাবা আমাদের সবাইকে মুড়ি মাখানো খাওয়ালেন। এত মজার মুড়ি আমি জীবনেও খাইনি। আবার গাড়িতে উঠে চোখ বন্ধ করে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে গেলাম। এবার ঘুম ভেঙে কাকার বাসায়। পরেরদিন বিয়ে। বড়দের শুধু কাজ আর কাজ। আমাদের শুধু খেলা আর মজা আর বারবার কল ছেড়ে পানি নিয়ে খেলা করা। ঝর্ণা ছেড়ে বারেবারে ভেজা। কি আনন্দ যখন তখন বৃষ্টিতে ভেজা!

    বিয়ের দিন বাসায় অনেক লোকের ভিড়। দুপুরে বরযাত্রী যাবে। মা আমাদের দুবোনকে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করিয়ে লাল জামা পড়িয়ে দুই হাত ভর্তি লাল কাচের চুড়ি, কানে সোনার দুল, মাথায় দুই ঝুটি করে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা দুবোন খুশিতে নেচে নেচে বেড়াছিলাম। সবাই ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখছিল আর আদর করে বলছিল পরীর মতো লাগছে। কে জানতো এটাই আমাকে মায়ের শেষ সাজানো। আমরা সবাই বড় একটা গাড়িতে করে নতুন কাকিদের বাসায় আসলাম। এসে দেখি টুকটুকে একটা লাল বউ স্টেজে বসে আছে। কি যে সুন্দর লাগছে! আমরা দু বোন নতুন কাকির কোলে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা দুবোন ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছিলাম। হঠাৎ দেখি গেটের সামনে একটা গাছের নিচে কিছু ফুল পড়ে আছে। ফুলগুলো দেখতে খুব সুন্দর। সাদার মাঝখানে হলুদ রঙের, আকারেও একটু বড়। খুব মিষ্টি ঘ্রাণ। আগে কখনো এই ফুল দেখিনি। নাম জানার প্রশ্নই আসে না। পরে বড় হয়ে নাম জেনেছি কাঠগোলাপ। আমরা দুজন গাছ ঝাঁকি দিয়ে ফুল পাড়ছিলাম। কিছুক্ষণ পর দুটো ছেলে আমাদের থেকে বড় শার্ট-প্যান্ট পরা আমাদের কাছে এসে গাছ ঝাঁকি দিয়ে ফুল পেড়ে দিছিল আর গল্প করছিল। আমরা ফুল ভালোবাসি কিনা, আরো ফুল নিব কিনা। ওরা বলল সামনেই ওদের বাড়ি। ওদের অনেক বড় বাগান অনেক রকম ফুলের গাছ। আমরা ওদের সাথে গেলে অনেক ফুল দেবে। আমরা দুবোন তো মহা খুশি। আমরা বললাম তোমরা নিয়ে আসো আমরা এখানে থাকি। ওরা বলল, তোমাদের দারোয়ান তো আমাদের আর ঢুকতে দিবে না। তোমরা চলো যেয়েই ফুল নিয়ে চলে আসবে বেশি দেরি হবে না। খুব বলছিল কোন ভয় নেই, যাবে আর ফুল নিয়ে চলে আসবে। তারপর বলল ঠিক আছে একজন চলো। প্রথমে আমার বড় বোনকে নেওয়ার জন্য হাত ধরে টানাটানি করতে লাগলো। ও কিছুতেই যাবে না। তারপর আমার হাত ধরে বলল, তুমি লক্ষ্মী মেয়ে তুমি চল। কোন ভয় নেই আমরা যাব আর ফুল নিয়ে চলে আসব। তোমার বোন এখানে দাঁড়িয়ে একশ পর্যন্ত গুনতে গুনতেই আমরা চলে আসব। ফুলের লোভ তো ছিলই আমি যেতে রাজি হলাম।

    আমরা কিছু দূর গিয়ে একটা গলি থেকে আরেক গলি তারপর আরেক গলি যেয়ে একটা বড় রাস্তার পাশে সুন্দর একটা বাড়ির সামনে থামলাম। আমি যতই বলছি ফুল নিব না আমি বাড়ি যাব। ওরা আমার কথা শুনছে না। এবার একটা ছেলে বলল, তোমরা দুজন এখানে দাঁড়াও। আমি ফুল নিয়ে আসছি। আমরা দুজন রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর আমার সাথের ছেলেটা বললো, ওমা! তোমার কানের দুল তো খুলে গেছে, আমি লাগিয়ে দেই। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর বলল, লাগাতে পারিনি। আমার হাতে কাগজে মোড়ানো একটা কিছু দিয়ে বলল, এটা কোথাও খুলবে না সোজা মাকে দিবে। আমি শিলার কাছে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এবার আমার সাথের ছেলেটা বলল, তুমি দাঁড়াও আমি ওকে নিয়ে আসি। আমি দাঁড়িয়ে আছি ওরা আর আসে না। আমিতো ভয়ে কান্না করতে করতে দৌড়। শিলার কাছে যাওয়ার জন্য দৌড়াতে থাকি কিন্তু কোথাও শিলাকে পাছি না। রাস্তায় বড় বড় গাড়ি দেখেই ভয় লাগছে আবার শিলাকে পাছি না। আমিতো হাউমাউ করে কাঁদছি আর শিলাকে ডাকছি, মাকে ডাকছি, বাবাকে ডাকছি। কিন্তু কেউ আমার কাছে আসছে না।

    হঠাৎ দেখি বড় একটা রেলগাড়ি আস্তে আস্তে থামছে। অনেক লোকের ভিড়। আমি এক মুহূর্তে কান্না ভুলে অবাক হয়ে রেলগাড়ি দেখতে লাগলাম। অনেক লোক গাড়ি থেকে নামছে। আমি আস্তে আস্তে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম অনেক লোক গাড়িতে উঠছে। আমিও কি মনে করে উঠে পড়লাম। অবাক হয়ে সবকিছু দেখতে লাগলাম। শিলার কথা, মার কথা ভুলে গেলাম। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে আমি খেয়ালই করিনি। খুব মজা লাগছিল, আমার মতো আরও ছোট ছোট অনেক বাচা ছিল। অনেক লোকের ভিড়, অনেক শব্দ। আমি এক জায়গায় বসে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল, দেখি চারদিকে অন্ধকার। পাশে বাবা-মা, শিলা কেউ নেই। আমি চিৎকার করে কান্না করছি, আমি বাবার কাছে যাব, মার কাছে যাব, শিলার কাছে যাব। সবাই জিজ্ঞেস করছে তোমার বাবার নাম কি? মার নাম কি? কার সাথে এসেছ? কোথা থেকে এসেছ? আমি কিছুই বলতে পারছি না। শুধু কান্না করছি আর বলছি বাবার কাছে যাব, মার কাছে যাব। আমাকে নিয়ে একটা হুলোস্থূল কান্ড শুরু হয়ে গেল। কেউ আমার কান্না থামাতে পারছে না। একজন লোক এগিয়ে এসে আমাকে কোলে নিয়ে আদর করে বলল, ঠিক আছে আমি তোমাকে তোমার বাবা-মার কাছে নিয়ে যাব। এবার কান্না থামিয়ে এগুলো আগে খাও। আমার হাতে এক প্যাকেট বিস্কুট, দুইটা কলা, কিছু চকলেট দিলেন আর সবাইকে ভিড় কমাতে বললেন। উনি আমার সাথে হেসে হেসে খুব মজা করে কথা বলছিলেন। আমাকে হাসানোর চেষ্টা করছিলেন। দূরের গাছপালা ঘরবাড়ি দেখাছিলেন। ধীরে ধীরে আমার কান্না কমে এলে উনি আমাকে কোলে বসিয়ে অল্প অল্প করে বিস্কুট-কলা মুখে তুলে দিছিলেন আর আমার কাছ থেকে জেনে নিছিলেন আমার নাম, ঠিকানা, কয় ভাইবোন, বাড়ি কোথায়? বাবার নাম কি? কি করে? ঢাকায় কেন এসেছি? বোন কোথায়? কাকার নাম কি? আমি খাছিলাম আর উত্তর দিছিলাম। কিন্তু আমার উত্তর শুনে আমার কোন ঠিকানা উদ্ধার করা গেল না।

    এবার বললেন, সবাই তোমার বাবাকে কি বলে ডাকতেন? আমি বললাম মিয়া ভাই, বড় ভাই, বড় কাকা আর দাদা-দাদি ডাকত বড় মিয়া বলে। এবার সবাই হতাশ হলো। একজন বলল, তুমি কিভাবে ট্রেনে এলে? আমি একে একে সব বললাম আর আমার হাতে কাগজে মুড়িয়ে যে জিনিস দিয়েছিল। সেটা আমার জামার ছোট পকেটে রেখে দিয়েছিলাম সেটা দেখালাম। খুলে দেখা গেল একটা গোল চাড়া প্যাঁচিয়ে দিয়েছে। সবাই তখন বুঝতে পারল আমি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলাম। উনি এবার বললেন তুমি ঘুমিয়ে পড় সকালে তোমার বাবা-মার কাছে যাব। আমি বললাম, তুমি কে? উনি বললেন, তোমার ভালো কাকু। আমি ভালো কাকুর কোলে জড়সড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

    সেই রাতে আমার জ্বর এসেছিল। জ্বরের ঘোরে বাবা-মা, শিলা, দাদা-দাদি সবাইকে খুঁজছিলাম। কোন উপায় না পেয়ে ট্রেন থেকে নেমে আমাকে খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। দুই দিন আমার কোন জ্ঞান ছিল না। কয়েকদিন পর আমি একটু সুস্থ হলে ভালো কাকু আমাকে আবার ঢাকায় এনে কমলাপুর রেলস্টেশনে আশেপাশে থানায় খোঁজখবর করলেন। প্রত্যেক থানায় আমার ছবি দিয়ে রাখলেন। আশপাশে এরিয়াতে কোন বাসায় বিয়ে হয়েছে কিনা, কোন বাসার মেয়ে হারিয়ে গেছে কিনা খোঁজ নিতে বললেন। সব থানায় ভালো কাকুর ঠিকানা রেখে আসলো। কয়েকটি পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদও ছাপা হলো। কিন্তু কোথাও থেকে কোন খবর পাওয়া গেল না। এতবড় ঢাকা শহরে শুধু দুটো নামের ভিত্তিতে কিভাবে আমার বাবা-মাকে খুঁজে পাবে। এক নিমিষেই যেন আমার বাবা-মা হাওয়াই মিলিয়ে গেলেন। কোথাও আমার বাবা-মার কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। জানি না আমাকে না পেয়ে বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা। আমাকে নিয়ে ভালো কাকু আবার খুলনায় ফিরে এলেন। ভালো কাকু তার সাধ্যমতো আমার বাবা-মাকে খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনো খবর পাওয়া গেল না।

    ভালো কাকুর নাম মেজবাহ উল হাসান। সবাই হাসান স্যার বলেই ডাকেন। উনি খুলনা খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কিছুদিন আগে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় ভালো কাকুর সাত বছরের মেয়ে হীরা আর স্ত্রী মারা যান। কিছুদিন আমি কান্নাকাটি করতে করতে ভালো কাকুর সাথে থাকতে শিখে গেলাম। কিন্তু সমস্যা হলো আমি কখনো ভালো কাকুকে চোখের আড়াল হতে দিতাম না। সব সময় ভয় পেতাম এই বুঝি ভালো কাকুকে হারিয়ে ফেলব। প্রথম প্রথম আমাকে নিয়ে সব জায়গায় যেতে হতো। এক সময় একা থাকাও শিখে গেলাম। ভালো কাকুর পরিচয়ে আমি বড় হতে লাগলাম। কবে কখন যেন ভালো কাকু ভালো বাবা হয়ে গেলেন। আমাদের বাবা মেয়ের দিন ভালোই কাটতে লাগল।

    আমার হাসবেন্ড রাতুল। ওর সাথে আমার পরিচয়টাও হয় অদ্ভুতভাবে। আমি তখন খুলনা বিএল কলেজ অর্থনীতিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমার তেমন কোন বন্ধু ছিল না। সহজে সবার সাথে মিশতে পারতাম না সব সময় ভয় হতো। আমার একমাত্র বান্ধবী রুমা আর আমি ক্যাম্পাসের মাঠে বসে গল্প করছিলাম।

    এমন সময় একটা ছেলে আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফোনে কথা বলছিল : হ্যালো শিলা এইটুকু শুনেই আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে বলেছিলাম শিলার সাথে কথা বলছেন। শিলার বোনের নাম কি মিলা? আমার এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে উনি তো অবাক হয়ে আমাকে বলল মানে। আমি তখনই আমার ভুল বুঝতে পেরে সরি বলে চলে আসি।

    এমন আমার প্রায়ই হতো শিলার নাম, খেলার সাথীদের কারো নাম শুনলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না। কোথায় বাড়ি খোঁজখবর নেয়া শুরু করে দিতাম। এরপর থেকে আমাদের দেখলে রাতুল এসে আমাদের কাছে বসত। রুমার সাথেই বেশি গল্প হতো। জানতে পারলাম ও আমাদের ডিপার্টমেন্টে পড়ে এক বছরের সিনিয়র। ওর বোনের নাম শিলা। ওরা খুলনার স্থানীয়। রাতুলের বাবা একজন নামকরা জাঁদরেল উকিল। এক নামে সবাই চেনেন। ওর বাবার নাম আমিনুল ইসলাম এবং মায়ের নাম আমেনা বেগম।

    একদিন রাতুল রুমাদের বাসায় যেয়ে আমার সম্পর্কে সব জানে। আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। একদিন রাতুল প্রস্তাব করে বাংলাদেশের যত নদী তীরবর্তী গ্রাম আছে আমরা সব গ্রামে যাব। খেলার সাথীদের নাম আর শিলার নাম মিলিয়ে বাবা-মাকে খুঁজে বের করব। আমারও মনে হলো এভাবে তো কখনো খোঁজা হয়নি।

    যেই ভাবা সেই কাজ শুরু করে দিলাম। আমরা দুজনে টিউশনি করা শুরু করলাম। সেই টাকা দিয়ে সময় সুযোগ পেলেই আমরা গ্রামে খুঁজতে যেতাম। প্রথমে তিনজন যেতাম। মাঝে মাঝে আমি আর রাতুল যেতাম, বেশি দূরে হলে রাতুল একাই যেত। কত গ্রামে যে গেছি, এক সময় আমি বুঝতে পারি এভাবে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু রাতুল হার মানবে না ও আমার বাবা- মাকে খুঁজে দেবেই। রাতুলের চোখেমুখে একটা অদ্ভুত সারল্য আছে। যা দেখে ওকে সহজেই বিশ্বাস করা যায়। রাতুলও কখনো বন্ধুত্বের গন্ডি অতিক্রম করেনি। সেই বিশ্বাস থেকেই দুজনে একসাথে পথচলার সিদ্ধান্ত।

    এখন আমাদের দুজনের নিজস্ব একটা পরিচয় হয়েছে। রাতুল সরকারি কলেজের প্রভাষক। আমি সমাজ কল্যাণ অফিসার। দুজনের পোস্টিং ঢাকায়। একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে শুধু দুই পরিবারের উপস্থিতিতে কাজি ডেকে রেজিস্ট্রি করে আমাদের বিয়ে। ওই ঘটনার পর থেকে আমি কখনো গহনা পরিনি, সাজুগুজুও করিনি। আজ রুমা জোর করে হালকা মেকআপ করে চোখে কাজল দিয়ে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। আমি অফ হোয়াইট রঙের জমিন চওড়া সোনালি পাড়ের শাড়ি ও সোনালি ব্লাউজ পড়ে কাঠগোলাপ ফুলের গহনা পরে বসে আছি। নিজেকে কাঠগোলাপ মনে হছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ অনেকদিন পর কিছুতেই চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারছি না। আমি আকুল হয়ে বসে কাঁদছি। কোথায় আমার বাবা-মা আছে? কেমন আছে? শিলা কি আমাকে খুঁজতে যেয়ে হারিয়ে গেছে নাকি বাবা-মার সাথে আছে। আমি মনেপ্রাণে চাই ও বাবা-মার আদর ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক। কেন যেন আজ খুব ওদের কথা বেশি মনে পড়ছে আর দু-চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

    এমন সময় খুট করে দরজা খোলার শব্দ হলে আমি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, রাতুল, রাতুলের বোন শিলা, ভালো বাবা। আমি দৌড়ে গিয়ে শাশুড়ি মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। দুই পাশ থেকে শ্বশুর-শাশুড়িও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন আর বলে আমরা শুধু তোর শ্বশুর-শাশুড়ি না। আজ থেকে তোর হারিয়ে যাওয়া বাবা-মা আর তুই আমাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে মিলা। আজ থেকে আমরা সবাই একসাথে থাকব। একথা শুনে আমি আরও জোরে আমার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম অনেক দিন পর আমার বাবা-মার গায়ের গন্ধ পাছি। সব বাবা-মার গায়ের গন্ধ কি এক! নাকি এটা ভালোবাসার গন্ধ! আমি মনে মনে আল্লাহতায়ালার কাছে হাজার শুকরিয়া জানাছি আল্লাহ শুধু আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়নি দিয়েছেন ও দুহাত ভরে। আজ বুঝতে পারছি বাবা-মা আমার কাছে না থাকলেও তাদের দোয়া সবসময় আমার সাথে ছিল। যেখানেই থাকো বাবা- মা ভালো থেকো। তোমরা থাকবে আমার হৃদয়ে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায়, ভালো লাগায়, শ্রদ্ধায়।

    Previous Articleপ্যালেস অফ সিঙ্গিং ঘোস্ট : আফসানা নীতু
    Next Article পদ্মআঁখি : নাজমুল হোসেন

    এ বিষয়ে আরও লেখা

    স্যাংশন : অহেদুজ্জামান

    নীল শার্ট : এহছানুল মালিকী

    একটি পেয়ারা গাছের কথা : পবিত্র সরকার

    ফেরা : মাহমুদ শরীফ

    এক টুকরো কাগজ ও দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি : সৈয়দ জুনায়েদ

    একদা পাত্রীর বাবা বেবিট্যাক্সির মালিক ছিল : রফিকুল ইসলাম সাগর

    অসমাপ্ত প্রেম চিঠি : মো. ইমরান খান

    যে গল্প কবিতার মতো বেদনার : শফিক মুন্সি

    নির্জন দ্বীপে কিশোর দল : সাগর আহমেদ

    জীবনের কিছু কথা : ইসরাত রুবাইয়া

    শরীরীয় প্রেতাত্মার কথকতা : কুসুম আক্তার নেকিজা

    কেউ কারো নেই : শহিদুল ইসলাম খোকন

    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    সাম্প্রতিক লেখা

    অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে : সেলিনা হোসেন (সাক্ষাৎকার)

    আমার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা : দেবেশ চন্দ্র সান্যাল (স্মৃতিচারণ)

    অদম্য কিশোর : শিবুকান্তি দাশ

    ছদ্মবেশী : শারমিন প্রিয়া

    অধিকার : অমল বিশ্বাস

    খোকন সোনা : মুহাম্মদ নূর ইসলাম

    ভুলে যেতে : মো. আমজাদ হোসেন

    বাহাদুরি : বিজন বেপারী

    চিরচেনা নাট্যমন্দির রোড! : আজমির রহমান রিশাদ

    মুখ মুখোশের আড়ালে : মুহিতুল ইসলাম মুন্না

    বেওয়ারিশ সম্পর্ক : বিপ্লব হোসেন

    সোনা মোড়ানো নুড়ি পাথর : মুসলেহা সুলতানা

    অভিমানী আমি : নাজমুন নাহার লাডলী

    অনুরক্তি : মো. জয়নুল ইসলাম

    তোমাকে পাওয়ার জন্য হে সফলতা : প্রহ্লাদ কুমার প্রভাস

    দান : আফছানা খানম অথৈ

    রোজা : রুমানা আক্তার রত্না

    মানুষ : নিহাদ হোসাইন

    ভাঙা চুড়ি : নয়ন আলী নাঈম

    স্মৃতির সারথি : ইয়াছিন আরাফাত

    আমাদের সম্পর্কে

    সূর্যাক্ষর বাংলাদেশের একটি উদিয়মান প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার বই প্রকাশের পাশাপাশি আমরা লিটলম্যাগ প্রকাশ করি। লিটলম্যাগের ক্ষেত্রে আমাদের দুটি মাধ্যম আছে। একটি অনলাইন পোর্টাল, আরেকটি ছাপা ম্যাগাজিন।

    যোগাযোগ
    • ঠিকানা: ৭৯/২/বি, ৯ নং লেন, কদমতলা, বাসাবো, ঢাকা-১২১৪
    • মোবাইল: ০১৭৩৭৭২৪০৬৯, ০১৭৮২৩৭৯৮৩৭
    • ইমেইল: ‍surjakkhor@gmail.com
    • ফেইসবুক গ্রুপ: www.facebook.com/groups/surjakkhor
    লেখা আহ্বান

    প্রবন্ধ, ছড়া-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি, চলমান ইস্যু নিয়ে আলোচনাসহ যেকোনো ধরনের লেখা পাঠানো যাবে। প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাসের একেকটা পর্ব কমপক্ষে এক হাজার শব্দের হতে হবে। কবিতায় শব্দ সংখ্যার সীমা নেই। তবে কমপক্ষে ১০/১২ লাইনের হলে ভালো হয়, ছোট হলে ছাপানো হবে না, এমনটা নয়। বড় হলেও চলবে। ই-মেইল: surjakkhor@gmail.com

    কপিরাইট সূর্যাক্ষর প্রকাশনী | গোপনীয়তা নীতি | শর্তাবলি ও নীতিমালা

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.