‘এই শোনো।’
দৈবাৎ পেছন থেকে একটা মৃদু কণ্ঠস্বর ঠেসে আসতেই পেছন ফিরে তাকালো অনীল। দীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট কালো চোখের একটি যুবতী মেয়ে কলেজের প্রথম তলার বেলকনি থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার গোলাপি ঠোঁটের কোনে তা স্পষ্ট বোঝা যাছে।
‘আমাকে বলছেন?’ প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললো অনীল।
‘হ্যাঁ, তোমাকে বলছি। একটু উপরে আসতে পারবে?’
আনীল বললো, ‘কেন নয়! দাঁড়ান আমি আসছি।’ সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির কাছে পৌঁছাল।
‘জি বলুন কি বলবেন?’
মেয়েটি আপাদমস্তক তার দিকে তাকিয়ে খানিক বাদে উত্তর দিল, ‘তুমি কি এ কলেজে নতুন?’
উত্তরে অনীল বললো, ‘জি, আপনি কি জন্য ডেকেছেন বলুন?’
‘দাঁড়াও এত ব্যস্ত হছো কেন, আজকে তোমাদের টিচার ছুটিতে আছে। তুমি একটু আমার সাথে এসো!’
‘কোথায় যাবো? তাছাড়া আমি তো আপনাকে চিনি না?’
‘তুমি আসো তো আগে!’ না চাওয়া শর্তেও কোনো এক অদৃশ্য মোহমায়ায় অনীল মেয়েটির সাথে চললো। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মেয়েটি বললো, ‘তোমার নাম কি?’
‘জি, অনীল। আর আপনার?’
‘আমি মাধুরী।’
‘তুমি বুঝি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র?’
‘হ্যাঁ, আপনি জানলেন কি করে?’
‘জানি, সবকিছুই জানি!’
‘মানে আপনি ঠিক কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না?’
এবার মেয়েটি একগাল হেসে বললো, ‘আরে তোমার সাথে মজা করছিলাম। আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তোমায় নতুন দেখলাম। তাই কথা বলতে ইছে হলো। তুমি আবার অন্য কিছু মনে করলে বুঝি!’
‘না, কি মনে করবো। আপনি আমার সিনিয়র!’
‘হুম-তা তো বটেই। তোমাকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম। তাই কথা বলতে ইছে হলো। চলো ওই বেঞ্চটায় বসি। ক্লাস শুরু হতে আরো ঢের দেরি।’
এরপর কি মনে হতেই অনীল বলে উঠলো, ‘আপনি কি আমায় চেনেন?’
মাধুরী একথা শুনে আড়চোখে তাকালো অনীলের দিকে।
‘না মানে তা বলতে চাইনি। শুধু বলছিলাম আপনার তো ক্লাস আছে। তা আপনি এখানে বসে থাকলে কেউ কিছু বলবে না? আর আমাকে আপনার সাথে দেখলে অন্যরা কি বলবে বলুন।’
কিন্তু মাধুরী যেন তার কোনো কথায় ভ্রুক্ষেপই করছে না। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়লো তার সাথে থাকা ব্যাগটা নিয়ে।
এর পর মাধুরী অনীলের হাতে একটা চিঠির খাম গুঁজে দিয়ে বললো, ‘এটা রাখো। আর সময়মতো এটা খুলবে।’
বলেই সে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার লাইব্রেরির দিকে কোথাও চলে গেল। এরপর আর তাকে কোথাও দেখতে পায়নি অনীল। স্তব্ধ হয়ে অনীল শুধু তাকিয়ে রইলো দোতলার দিকে। মুখ দিয়ে আর কিছুই সে বলতে পারলো না। কোনো এক আকস্মিক টান যেন অনুভব করলো অনীল মাধুরীর প্রতি।
চিঠিটা হাতে নিয়ে সে তার ক্লাসের দিকে রওনা হতেই শুনতে পেল পুরো কলেজ জুড়ে হইরই কাণ্ড। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো আধ ঘণ্টা আগেই অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের মাধুরী নামের এক ছাত্রী কলেজের লাইব্রেরি রুমের ফ্যানের সাথে দড়ি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এটা শোনার পর অনীলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! এই তো ৫ মিনিট আগেও সে তার সাথে ছিল। তবে কি…? কথাটা বলেই সে দৌড়ে দোতলার লাইব্রেরি রুমে ঢুকে দেখে তখনও ফ্যানের সাথে ঝুলছে মাধুরীর দেহ। মানুষজন যেন উপচে পড়ছে সেখানে! অনীল সকলকে ঠেলে কাছে গিয়ে দেখতেই অবাক হলো; তার শরীরে অনেক আঘাতের দাগ, আর তার পায়ের কাছে একটি রবীন্দ্র রচনাবলী পড়ে আছে! ক্ষতস্থান থেকে একটু একটু করে গড়িয়ে পড়ছে লাল রক্ত। মাধুরীর চোখের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠল অনীল। মাধুরীর ওই বিস্মিত চোখ দুটো যেন এখনই উঠে কিছু বলবে! মাধুরীর এ মৃত্যু দৃশ্য অনীলের আর সহ্য হলো না। সে তাৎক্ষণিক বেরিয়ে পড়ল ওই লাইব্রেরি থেকে। তার যেন অনেক মায়া হলো মাধুরীর প্রতি!
কিন্তু কেন? সে কারণ আর খুঁজে পেল না অনীল। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারল না মাধুরী আত্মহত্যার পর তার সামনে কেন উদয় হলো। তবে কি এটি আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু! এসব যেন অনীলের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো।
এদিকে পুলিশের গাড়ি এসে ভরে গেল কলেজ। কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুলেন্সও এলো! মাধুরীর দেহ তারা নিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্স করে। খবরটা পুরো সোসাইটিতে ছড়িয়ে পরতে বেশি সময় লাগেনি। পুলিশ কলেজ কর্তৃপক্ষের সকলকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হওয়ার পর তারা এ ঘটনার অনুসন্ধান কার্য চলানোর জন্য কলেজ কিছু দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। অনীল সেখানে কিছুই আর বলতে পারেনি, কারণ তাহলে পুলিশ তাকেই মাধুরীর আত্মহত্যার কারণ বলে মনে করতে পারে। অনীল দেখলো পুলিশ সকল ছাত্রছাত্রীর বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলছে। তাই সকলে এক এক করে বেরিয়ে এলো কলেজ থেকে আর যার যার বাড়ি চলে গেল। এবার অনীলও বেরিয়ে পরে কলেজ থেকে। অনীল কিছু বুঝতে পারছে না এমনটি কি করে হলো। মনে মনে ভাবতে থাকে কেন মাধুরী তাকে এভাবে দেখা দিল, সে তো তাকে চিনতও না। এই বলে হাতে থাকা মাধুরীর দেওয়া চিঠিটা পড়তেই পুরো চক্ষু-ছানাবড়া হয়ে গেল।
সাদা কাগজের মধ্যে বড় বড় করে লেখা, ‘তোমার কাছে কি করে প্রমাণ করব যে আমার মৃত্যুর জন্য আসলে তোমাদের কলেজের প্রায় সক্কলে দায়ী! বিশেষ করে তোমাদের সে শিক্ষক! যার জন্য আজ আমার এই অবস্থা। বেশিদিন নয় যেদিন আমি কলেজে প্রথম ভর্তি হই, আমার বাবা নেই মা আর আমিই ছিলাম আমাদের পরিবারে। তোমাদের সে শিক্ষক রহিত আমাকে সবসময়ই বিরক্ত করত। একদিন সে আমাকে তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেয় যেটায় আমি না করে দেই কিন্তু সে আমার পিছু কিছুতেই ছাড়ছিল না। একদিন সে সবার সামনে আমাকে খারাপ বানিয়ে ফেলে। সকলে ভাবতো আমিই বুঝি তাকে পাওয়ার জন্য এসব করছি।’
‘একদিন আমার মা অসুস্থ ছিল। সেদিন বাজার থেকে ফেরার পথে সে আমাকে আটকায়। আমি সেদিন অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে আর রক্ষা করতে পারিনি। এই জীবন নিয়ে আমি আর কি করবো! তাই আমি এ সিদ্ধান্ত! আমি চাইনি আমার কারণে আমার মাও সকলের চোখে তার সম্মানটুকু খোয়াক!’
চিঠিটা শেষ হতেই অনীল সবকিছু বুঝতে পারে। সেদিন রাতে অনীল খোঁজ নিয়ে মাধুরীর বাড়িতে পৌঁছায়। বাড়ি পৌঁছে সে জানতে পারে তার একমাত্র মেয়ে মাধুরীর মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে তিনিও হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এটি যেন তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সে অনেক দুঃখ পায়। অনীল এবার সিদ্ধান্ত নেয়, সে মাধুরীর মৃত্যুর ন্যায়বিচার করবে।
সেদিন রাতে সে আর বাড়ি যায়নি। সে তার এক বন্ধুর বাড়িতে থেকে যায়। পর দিন সকালে অনীল পুলিশ স্টেশনে যায় এবং সবকিছু খুলে বলে। পুলিশ তার কাছ থেকে পাওয়া প্রমাণ আর স্বাক্ষর ভিত্তিতে এবং তাদের অনুসন্ধানের সমস্ত প্রমাণের সাথে রহিতকে গ্রেফতার করে। সারাদিনের ধকল শেষে অনীল এবার একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসে। বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা কল এসেছে। ফোন থেকে মনোযোগ সরিয়ে চা ওয়ালাকে উদ্দেশ করে বলে ‘এক কাপ চা দিন তো।’
পরক্ষণেই দোকানের রেডিও থেকে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠে একটা গানের লাইন, ‘যদি থাকি কাছাকাছি দেখিতে না পাও ছায়ার মতোন আছি না আছি, তবু মনে রেখো… ’

